সোমবার

২৫ মে, ২০২৬ ১১ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

ঈদে পশুবাহী ট্রাকে চাঁদাবাজির অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৫ মে, ২০২৬ ০৭:৪২

শেয়ার

ঈদে পশুবাহী ট্রাকে চাঁদাবাজির অভিযোগ
প্রতীকী ছবি

কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন মহাসড়কে পশুবাহী ট্রাক থেকে ব্যাপক চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে। উত্তরাঞ্চলের বৃহত্তম পশুর মোকাম রাজশাহী সিটি হাট থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পশু পরিবহনের সময় মহাসড়কের একাধিক পয়েন্টে ট্রাক থামিয়ে অর্থ আদায়, কাগজপত্র পরীক্ষার নামে হয়রানি এবং কিছু ক্ষেত্রে ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটছে বলে অভিযোগ করেছেন ট্রাকচালক, ব্যবসায়ী ও খামারিরা। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এসব কারণে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে এবং এর প্রভাব পড়ছে কোরবানির পশুর বাজারমূল্যে।

পশু ব্যবসায়ী ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলার মধ্যে পশু কেনাবেচার অন্যতম বৃহৎ কেন্দ্র রাজশাহী সিটি হাট। প্রতিদিন সেখানে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার গরু, ছাগল ও মহিষ বিক্রি হয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পাইকাররা এই হাট থেকে পশু কিনে ট্রাকে করে নিজ নিজ এলাকায় নিয়ে যান। প্রতিরাতে প্রায় ৫০০ পশুবাহী ট্রাক রাজশাহী থেকে দেশের বিভিন্ন গন্তব্যের উদ্দেশে ছেড়ে যায়।

ট্রাকচালকদের অভিযোগ, রাজশাহীর বেলপুকুর, পুঠিয়া, নাটোরের বনপাড়া, সিরাজগঞ্জের যমুনা সেতু এলাকা, টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা ও সখিপুর, গাজীপুর চৌরাস্তা, রাজধানীর গাবতলী, শনির আখড়া, মদনপুর, গাউছিয়া ও আড়াইহাজারসহ বিভিন্ন স্থানে ট্রাক থামিয়ে অর্থ আদায় করা হয়। এছাড়া কুমিল্লা, ফেনী ও চট্টগ্রামমুখী সড়কের একাধিক পয়েন্টেও একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে। তাদের দাবি, প্রতিটি ট্রাক থেকে পথে পথে ৭ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়।

চালকদের ভাষ্য অনুযায়ী, চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে কাগজপত্র তল্লাশির নামে দীর্ঘ সময় ট্রাক আটকে রাখা, মামলা দেওয়ার ভয় দেখানো এবং বিভিন্ন ধরনের হয়রানির শিকার হতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে ট্রাকের প্রয়োজনীয় নথিপত্রে সামান্য ত্রুটি পেলেও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

ট্রাকচালকদের আরও অভিযোগ, গভীর রাতে চলন্ত ট্রাক থামাতে ঝুঁকিপূর্ণভাবে সংকেত দেওয়ায় দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়। পাশাপাশি ঢাকা ও আশপাশের কয়েকটি এলাকায় ফ্লাইওভারের ওপর ট্রাকের গতি কমে গেলে সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারীরা চালকদের কাছ থেকে নগদ অর্থ, মোবাইল ফোন ও অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটছে।

রাজশাহীর এক ট্রাক মালিক জানান, বর্তমানে রাজশাহী থেকে ঢাকায় একটি পশুবাহী ট্রাকের ভাড়া প্রায় ৪০ হাজার টাকা এবং চট্টগ্রামে ৫৫ হাজার টাকা। তবে পথে চাঁদা বাবদ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ ব্যয় হওয়ায় পরিবহন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি ও অন্যান্য ব্যয়ের সঙ্গে এ অতিরিক্ত খরচ ব্যবসায়িক লাভ কমিয়ে দিচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।

সাতক্ষীরাতেও একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, জেলার বিভিন্ন প্রবেশপথ, মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কে পশুবাহী ট্রাক থামিয়ে লাইন খরচ, শ্রমিক খরচ, ম্যানেজ বা চেকিংয়ের নামে অর্থ আদায় করা হচ্ছে। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ট্রাক আটকে রাখা কিংবা ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনাও ঘটছে বলে তারা জানান।

সাতক্ষীরা সদর উপজেলার গরু ব্যবসায়ী হাফিজুল ইসলাম বলেন, একটি ট্রাকে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকার গরু পরিবহন করা হয়। পথে কোনো জটিলতা তৈরি হলে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। এ কারণে অনেক ব্যবসায়ী বাধ্য হয়ে অর্থ প্রদান করেন।

কলারোয়া এলাকার ট্রাকচালক তরিকুল ইসলাম বলেন, ঈদের আগে পশুবাহী ট্রাক দেখলেই বিভিন্ন পরিচয়ে লোকজন এসে টাকা দাবি করে। পুরো পথে কয়েক হাজার টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হয়ে যায়।

রাঙামাটিতেও পশুবাহী ট্রাক, ট্রলার ও নৌযান থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল থেকে পশু পরিবহনের সময় বিভিন্ন স্থানে অর্থ দিতে হয়। এছাড়া রাঙামাটি থেকে চট্টগ্রাম ও ঢাকামুখী সড়কের কয়েকটি পয়েন্টেও একই ধরনের চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন পরিবহন শ্রমিক সংগঠনের কয়েকজন নেতা। তাদের দাবি, সংগঠনের নামে কেউ অবৈধভাবে অর্থ আদায় করলে তা ব্যক্তিগত দায়, সংগঠন এ ধরনের কর্মকাণ্ড সমর্থন করে না।

অভিযোগের বিষয়ে বগুড়া হাইওয়ে পুলিশের পুলিশ সুপার আবু তোরাব মোহাম্মদ শামসুল আলম বলেন, এ ধরনের কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তাদের কাছে আসেনি। তবে বিষয়টি নিয়ে নজরদারি চলছে। কোনো পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

হাইওয়ে পুলিশ উত্তর অঞ্চলের উপমহাপরিদর্শক আব্দুল্লাহ হিল বাকি বলেন, মহাসড়কে পশুবাহী যানবাহন থেকে চাঁদাবাজি প্রতিরোধে পুলিশ সতর্ক রয়েছে। অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্তসাপেক্ষে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল গোলচত্বরে পশুবাহী ট্রাক থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগে হাইওয়ে পুলিশের এক উপপরিদর্শক ও পাঁচ কনস্টেবলকে বগুড়া রেঞ্জে ক্লোজড করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে পশু পরিবহনে চাঁদাবাজি ও হয়রানি বন্ধ করা না গেলে পরিবহন ব্যয় আরও বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে কোরবানির পশুর বাজারে মূল্যবৃদ্ধির চাপ সৃষ্টি হতে পারে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ ক্রেতাদের ওপরই পড়বে।



banner close
banner close