বৃহস্পতিবার

২৫ জুন, ২০২৬ ১১ আষাঢ়, ১৪৩৩

ঋণ সংকটে হবিগঞ্জের ৪ চা বাগানে বেতন বন্ধ, দুর্ভোগে ৫ হাজার শ্রমিক

হবিগঞ্জ প্রতিনিধি:

প্রকাশিত: ২৪ মে, ২০২৬ ১৮:২২

শেয়ার

ঋণ সংকটে হবিগঞ্জের ৪ চা বাগানে বেতন বন্ধ, দুর্ভোগে ৫ হাজার শ্রমিক
ছবি বাংলা এডিশন

প্রত্যাশার তুলনায় কম ঋণ পাওয়ায় হবিগঞ্জের দেউন্দি, নোয়াপাড়া, লালচান ও মৃতিঙ্গা চা বাগানে তীব্র অর্থ সংকট দেখা দিয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে প্রায় পাঁচ হাজার শ্রমিকের জীবনে। কয়েক সপ্তাহ ধরে নিয়মিত তলবি ও বেতন না পাওয়ায় শ্রমিকরা পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। সামনে ঈদুল আজহা থাকায় বেতন, বোনাস ও অন্যান্য সুবিধা পাওয়া নিয়ে তাদের মধ্যে চরম উদ্বেগ, ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, বাগানগুলোতে উৎপাদন কার্যক্রম চললেও শ্রমিকদের মুখে স্বস্তির ছাপ নেই। নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য ও সংসারের খরচ জোগাড় করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে অধিকাংশ পরিবারকে। কেউ ধার-দেনা করে সংসার চালাচ্ছেন, আবার কেউ অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটাচ্ছেন। শিশুদের লেখাপড়া, চিকিৎসা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটানো নিয়েও দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তারা।

শ্রমিকদের অভিযোগ, গত বৃহস্পতিবারের তলবিও এখনো পরিশোধ করা হয়নি। কয়েক সপ্তাহ ধরে অনিয়মিতভাবে বেতন দেওয়া হচ্ছে। এতে তাদের আর্থিক সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে ঈদকে সামনে রেখে নতুন পোশাক, খাদ্যসামগ্রী ও প্রয়োজনীয় কেনাকাটা নিয়ে পরিবারগুলোর উৎকণ্ঠা বেড়েছে।

শ্রমিক সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম কৃষি ব্যাংক থেকে সংশ্লিষ্ট চারটি চা বাগানের জন্য ৪০ কোটি টাকা ঋণ অনুমোদনের কথা থাকলেও বাগান কর্তৃপক্ষ পেয়েছে মাত্র ২৫ কোটি টাকা। প্রত্যাশিত অর্থ না পাওয়ায় শ্রমিকদের বেতন-ভাতা, ঈদ বোনাস এবং বাগানের স্বাভাবিক পরিচালনায় সংকট তৈরি হয়েছে। বাগান কর্তৃপক্ষের দাবি, অর্থের ঘাটতির কারণেই নিয়মিত তলবি পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে না।

অর্থ সংকটের পাশাপাশি পর্যাপ্ত সার সরবরাহ না থাকায় চা উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, প্রতি বছর এসব বাগানে ২৮ থেকে ৩০ লাখ কেজি চা উৎপাদিত হলেও চলতি মৌসুমে উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে কমে যেতে পারে। ফলে বাগানগুলোর সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কা রয়েছে।

চা শ্রমিকদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরেই নানা সমস্যার মধ্যে কাজ করলেও এবার পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ। নিয়মিত বেতন না পেলে পরিবারের খাবার জোগাড় করাই কঠিন হয়ে পড়ে। অনেকেই স্থানীয় দোকানে বাকিতে নিত্যপণ্য কিনে সংসার চালাচ্ছেন।

লস্করপুর ভ্যালির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মনিশংকর বাউরি বলেন, “শ্রমিকরা খুবই কষ্টে আছেন। ঈদের আগে বেতন ও বোনাস পরিশোধ না হলে তাদের পক্ষে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। আমরা আগামী বৈঠকে বসে পরবর্তী আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করবো।”

দেউন্দি চা বাগানের সভাপতি আপন সাওতাল অভিযোগ করে বলেন, “বারবার মালিকপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর সমাধান পাওয়া যায়নি। তারা শুধু আশ্বাস দিয়ে সময়ক্ষেপণ করছে। দ্রুত বকেয়া পরিশোধ না হলে শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ আরও বাড়তে পারে।”

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, দেশের গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি খাতগুলোর মধ্যে চা শিল্প অন্যতম। কিন্তু শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত না হওয়ায় প্রায়ই এ খাতে সংকট তৈরি হচ্ছে। তারা শ্রমিকদের বকেয়া মজুরি দ্রুত পরিশোধ, প্রয়োজনীয় ঋণ সহায়তা প্রদান এবং উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, চলমান সংকট দ্রুত সমাধান না হলে যে কোনো সময় শ্রমিক আন্দোলন আরও তীব্র আকার ধারণ করতে পারে, যা চা শিল্পের উৎপাদন ও রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।



banner close
banner close