দেশে সাম্প্রতিক জ্বালানি সংকটের পেছনে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি নয়, মূল ভূমিকা রেখেছে বৈধ বিপণনব্যবস্থার বাইরে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা একটি শক্তিশালী অবৈধ সিন্ডিকেট। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, দেশের জ্বালানি বাজারের বড় অংশ নিয়ন্ত্রিত হয় চোরাই পথে আনা তেলের মাধ্যমে, আর এই অবৈধ বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ এখনো পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও আমলা-ঘনিষ্ঠ একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর হাতে।
দ্বিগুণ আমদানিতেও কাটেনি সংকট
চট্টগ্রাম বন্দর ও কাস্টমস সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ মার্চ থেকে ৯ মে পর্যন্ত মাত্র ৭০ দিনে ৯৭টি জাহাজে ২৭ লাখ টনেরও বেশি জ্বালানি আমদানি করা হয়েছে, যার মোট মূল্য ২০ হাজার ৯৩৮ কোটি টাকা। এই সময়ে ডিজেল, এলপিজি, এলএনজি, জেট ফুয়েল, ফার্নেস অয়েল, অকটেন ও অপরিশোধিত তেল মিলিয়ে আমদানির পরিমাণ ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১২ লাখ টন বেশি। অথচ এই বিপুল আমদানির পরও মার্চের শুরু থেকে এপ্রিলের শেষ পর্যন্ত দেশজুড়ে তীব্র জ্বালানি সংকট অব্যাহত ছিল। দেশের বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ যানবাহনের সারি ছিল, বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গিয়েছিল এবং শিল্পকারখানার উৎপাদন হুমকির মুখে পড়েছিল।
দাম বাড়তেই রাতারাতি সংকটের অবসান
সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে পাম্পে সরবরাহ বাড়ানো ও বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করে, কিন্তু কোনো কাজে আসেনি। পরে ১৯ এপ্রিল সরকার ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম লিটারে ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি করলে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। ২৫ এপ্রিলের মধ্যেই পরিস্থিতি প্রায় স্বাভাবিক হয়ে আসে। দুই মাসের বেশি সময় ধরে চলা সংকট দাম বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গেই অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার এই ঘটনা সংকটের প্রকৃত কারণ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছে।
কেন থামে, কেন চলে সিন্ডিকেটের তেল
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বৈধভাবে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) অধীনে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েল কোম্পানি জ্বালানি বিপণনের দায়িত্বে থাকলেও বাস্তবে বাজারের বড় অংশ পরিচালিত হয় অবৈধ সরবরাহের মাধ্যমে। সদ্য অবসরে যাওয়া পদ্মা অয়েল কোম্পানির মার্কেটিং বিভাগের এক মহাব্যবস্থাপক জানান, চোরাই পথে বিপিসির বিক্রির প্রায় দ্বিগুণ পরিমাণ তেল দেশে আসে বলে বিপণন প্রতিষ্ঠানগুলোর পর্যবেক্ষণ।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধাবস্থার আগে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল ডিজেলের দাম ছিল ৯০ ডলারের নিচে। তখন পরিবহন ব্যয়, ভ্যাট ও কর মিলিয়ে প্রতি লিটারের আমদানি খরচ পড়ত ৬৬ থেকে ৬৮ টাকা, অথচ খোলা বাজারে বিক্রি হতো ১০০ টাকায়। কিন্তু মার্চে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল ডিজেলের দাম ২১৩ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ায় আমদানি খরচ প্রতি লিটারে প্রায় ২০০ টাকায় পৌঁছায়। স্থানীয় বাজারে দাম না বাড়ানোয় চোরাই তেল আনা অলাভজনক হয়ে পড়ে এবং সিন্ডিকেট সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। সরকার দাম বাড়ানোর পর ফের চোরাই পথে তেল আসা শুরু হয়, তাতেই বাজারে স্থিতিশীলতা ফেরে।
১৬২ ট্যাংকারের ১১৮টির মালিক আওয়ামী-সংশ্লিষ্ট
বিপিসি সূত্র জানায়, জ্বালানি তেল পরিবহনে ব্যবহৃত লাইটার অয়েল ট্যাংকারই চোরাই তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণের প্রধান মাধ্যম। বিপিসির জ্বালানি সরবরাহে নিয়োজিত ১৬২টি অয়েল ট্যাংকারের মধ্যে ১১৮টির মালিক পতিত আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিপিসি সূত্র আরও জানায়, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীরের নামে তিনটি জাহাজ নিবন্ধিত রয়েছে। নারায়ণগঞ্জের সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের পুত্র ইমতিনান ওসমানের নামে রয়েছে দুটি জাহাজ। সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদ, ঢাকা দক্ষিণের সাবেক মেয়র ফজলে নূর তাপস, সাবেক চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন, সাবেক সংসদ সদস্য আলাউদ্দিন মোহাম্মদ নাসিম ও নোয়াখালীর সাবেক সংসদ সদস্য মো. ইব্রাহিমসহ আরও কয়েকজনের নামে একাধিক জ্বালানিবাহী জাহাজের মালিকানা রয়েছে বলে সূত্র দাবি করেছে। তবে এসব অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি এবং অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা পলাতক থাকলেও তাদের মনোনীত প্রতিনিধি বা নতুন অংশীদারদের মাধ্যমে জাহাজগুলো পরিচালিত হচ্ছে বলে সূত্র জানিয়েছে।
চোরাই তেল আসে যেভাবে
সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম বন্দর বাংকারিং সুবিধাসম্পন্ন হওয়ায় বিদেশি জাহাজ জ্বালানি সংগ্রহের অজুহাতে বন্দরের জলসীমায় প্রবেশ করতে পারে। সিন্ডিকেট এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বহির্নোঙরে অবস্থানরত জাহাজ থেকে লাইটার ট্যাংকারে তেল খালাস করে। বাইরে থেকে এটি লোডিং নাকি আনলোডিং, তা বোঝার উপায় থাকে না। জাহাজভাঙা শিল্পে আসা জাহাজ ব্যবহার করেও জ্বালানি আনার অভিযোগ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ
ইস্টার্ন রিফাইনারির সাবেক মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মানজারে খোরশেদ আলম জানান, রাষ্ট্রীয় বিপণনব্যবস্থার বাইরে একটি অদৃশ্য শক্তি বহু বছর ধরে জ্বালানি তেলের বিশাল বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে, বিষয়টি বিপিসিসহ জ্বালানি-সংশ্লিষ্টদের কাছে উন্মুক্ত রহস্য। সংকটকালীন আড়াই মাসে দ্বিগুণ তেল এনেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা না যাওয়া প্রমাণ করে বাজারে ওই সিন্ডিকেটের অংশীদারত্ব বিপিসির চেয়ে বেশি। তিনি এই সংকটকে একটি সুযোগ হিসেবে দেখে জ্বালানি খাতের দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করতে এবং মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
বিপিসির মার্কেটিং বিভাগের সাবেক এক মহাব্যবস্থাপক (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) জানান, বছরে ১০ থেকে ১২ শতাংশ হারে চাহিদা বাড়লেও বিপিসি ও বিপণন প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে জ্বালানি খাত ক্রমশ চোরাই তেলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
বিপিসির বক্তব্য
বিপিসির বাণিজ্য ও অপারেশন বিভাগের মহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসাইন স্বীকার করেন, দাম বাড়ানোর পর কীভাবে সংকট সমাধান হয়ে গেল সে প্রশ্নের উত্তর তাঁর জানা নেই। তিনি বিষয়টি অনুসন্ধান করে বিপিসিকে জানানোর অনুরোধ জানান। বিপিসি চেয়ারম্যান রেজানুর রহমানের কাছ থেকে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
আরও পড়ুন:








