রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চাঁদাবাজির ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় ব্যবসায়ী, শিল্পোদ্যোক্তা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যমতে, রাজধানীকেন্দ্রিক একটি বিশেষ তালিকায় চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত ১ হাজার ২৮০ জনের নাম উঠে এসেছে। একই সঙ্গে তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতা হিসেবে ৩১৪ জনকে চিহ্নিত করা হয়েছে। সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিশেষ অভিযান পরিচালনা করলেও বিভিন্ন খাতে চাঁদাবাজি অব্যাহত রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীর উত্তরা ও বারিধারায় পৃথক দুটি ঘটনায় চাঁদা দাবিকে কেন্দ্র করে হামলার অভিযোগ পাওয়া গেছে। শুক্রবার রাতে উত্তরার ৭ নম্বর সেক্টরে এক গার্মেন্টস ব্যবসায়ীর বাসার প্রধান ফটক লক্ষ্য করে দুর্বৃত্তরা গুলি ছোড়ে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এর আগে গত ১০ মার্চও একই বাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়েছিল। একই দিন বিকেলে বারিধারার একটি গাড়ির শোরুমের সামনে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। পরবর্তীতে শোরুম মালিকের কাছে বিদেশি নম্বর থেকে ফোন করে এক কোটি টাকা চাঁদা দাবি এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ব্যবসায়ী সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, ফুটপাত, পরিবহন, নির্মাণ, গার্মেন্টস, ঝুট ব্যবসা, ভাঙারি, ইন্টারনেট সংযোগ, ময়লা পরিবহন, বাজার ব্যবস্থাপনা, গ্যারেজ, বস্তি এবং বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠানসহ নানা খাতে চাঁদাবাজি বিস্তৃত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাবের কারণে ভুক্তভোগীরা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করতে অনীহা প্রকাশ করছেন বলে জানা গেছে।
চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে জনমত ও প্রতিবাদ কর্মসূচি বাড়তে থাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপরতা জোরদার করেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় ঢাকা মহানগর পুলিশ চাঁদাবাজির স্পট ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তালিকা প্রস্তুত করে। ডিবি, এসবি এবং ডিএমপির গোয়েন্দা ইউনিটের সমন্বয়ে তৈরি ওই তালিকার ভিত্তিতে গত ১ মে থেকে বিশেষ অভিযান শুরু হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, অভিযানে এ পর্যন্ত তিন শতাধিক তালিকাভুক্ত চাঁদাবাজকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একই সঙ্গে সন্ত্রাসী ও মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধেও অভিযান চলছে।
পুলিশের মহাপরিদর্শক মোহাম্মদ আলী হোসেন ফকির বলেন, চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের কোনো দলীয় পরিচয় নেই। কোনো ব্যক্তি অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেলে তাকে অপরাধী হিসেবেই বিবেচনা করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও হবে।
র্যাবের মহাপরিচালক মো. আহসান হাবীব পলাশ বলেন, চাঁদাবাজদের তালিকা নিয়ে সারা দেশে র্যাব কাজ করছে। বিভিন্ন অভিযানে নিয়মিত চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। তবে অনেক ভুক্তভোগী মামলা করতে রাজি না হওয়ায় কিছু ক্ষেত্রে আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণে জটিলতা তৈরি হচ্ছে।
চলতি বছরের ৬ মে ঢাকা-৪ আসনের জামায়াতপন্থী সংসদ সদস্য জয়নুল আবেদীনের ভাগিনা আসাদুজ্জামান সাব্বিরকে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করে র্যাব। তার বিরুদ্ধে এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে অর্থ ছিনতাইয়ের অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে তিনি কারাগারে রয়েছেন।
এ ছাড়া গত ১০ এপ্রিল রাজধানীর শ্যামলীতে অবস্থিত সিকেডি ইউরোলজি হাসপাতালে চাঁদা দাবির অভিযোগে যুবদলের বহিষ্কৃত সাবেক নেতা মঈন উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে এ ঘটনায় তার আরও কয়েক সহযোগীকেও আটক করা হয়। গত ১৬ মে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে প্রশাসনিক কর্মকর্তার কক্ষে ঢুকে অস্ত্র প্রদর্শন এবং নিয়োগে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও আলোচনায় আসে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র কয়েকজন স্থানীয় প্রভাবশালীর সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে।
ব্যবসায়ী মহলের অভিযোগ, দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে নানা অজুহাতে নিয়মিত অর্থ আদায় করা হচ্ছে। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, শিল্পমালিক ও ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন পর্যায়ে চাঁদা দিতে বাধ্য করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে চাঁদাবাজরা নিজেদের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের কর্মী পরিচয় দিয়ে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করছে।
আইনশৃঙ্খলা বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর চাঁদাবাজ চক্রের নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণে পরিবর্তন এলেও অপরাধের ধরন ও বিস্তার কমেনি। তাদের মতে, চাঁদাবাজি এখন কেবল বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এটি দীর্ঘদিনের একটি কাঠামোগত সমস্যা, যার সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাব, স্থানীয় ক্ষমতার বলয় এবং দুর্বল জবাবদিহিতার বিষয়গুলো জড়িত। তারা মনে করেন, দলীয় পরিচয় বিবেচনা না করে কঠোর আইন প্রয়োগ, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা বৃদ্ধি এবং ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর অগ্রগতি সম্ভব হবে।
আরও পড়ুন:








