বৃহস্পতিবার

২৫ জুন, ২০২৬ ১১ আষাঢ়, ১৪৩৩

ঈদ এলেও ফিরছে না রোহিঙ্গারা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৪ মে, ২০২৬ ০৭:৪১

শেয়ার

ঈদ এলেও ফিরছে না রোহিঙ্গারা
ছবি সংগৃহীত

ঈদ আসে, ঈদ চলে যায়। কিন্তু মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের অপেক্ষায় থাকা লাখো রোহিঙ্গার জীবনে দেশে ফেরার স্বপ্ন এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। গত বছর রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনকালে দেওয়া আশাব্যঞ্জক বক্তব্যের পরও প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় হতাশা বাড়ছে শরণার্থী জনগোষ্ঠীর মধ্যে।

কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে অবস্থিত ৩৩টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের অনেকেই জানিয়েছেন, ২০২৫ সালের রমজান মাসে ক্যাম্প পরিদর্শনকালে অন্তর্বর্তী সরকারের তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস তাদের দ্রুত প্রত্যাবাসনের বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন। তবে এক বছর পার হলেও প্রত্যাবাসন কার্যক্রম শুরু না হওয়ায় সেই আশ্বাসের বাস্তব প্রতিফলন দেখতে পাননি তারা।

সরকারি ও আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া এখনো বিভিন্ন কূটনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত জটিলতার মধ্যে রয়েছে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান সংঘাত এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা প্রত্যাবাসনের অন্যতম প্রধান বাধা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে নতুন করে সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গার সংখ্যাও বেড়েছে।

গত ১৬ মার্চ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের তথ্যমতে, গত ১৫ মাসে বাংলাদেশে নতুন নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৪৪ হাজার ৪৫৬ জন। সরকারি হিসাবে দেশে রোহিঙ্গার সংখ্যা সাড়ে ১৩ লাখের কাছাকাছি হলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ভাসানচরসহ ৩৪টি আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থানরত রোহিঙ্গার প্রকৃত সংখ্যা ১৪ লাখ অতিক্রম করেছে।

এদিকে গত ৩০ মার্চ জাতীয় সংসদে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ জানান, বাংলাদেশ এ পর্যন্ত ৮ লাখ ২৯ হাজার ৩৬ জন রোহিঙ্গার তথ্য মিয়ানমার সরকারের কাছে পাঠিয়েছে। এর মধ্যে ২ লাখ ৫৩ হাজার ৯৬৪ জনকে মিয়ানমারের পূর্ববর্তী বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। তবে এ শনাক্তকরণ প্রত্যাবাসন কার্যক্রম শুরু হওয়ার নিশ্চয়তা নয়।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, প্রত্যাবাসন বিষয়ে আলোচনা ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলেও বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ এখনো সৃষ্টি হয়নি। নিরাপত্তা, নাগরিক অধিকার ও টেকসই পুনর্বাসনের নিশ্চয়তা ছাড়া প্রত্যাবাসন কার্যকরভাবে শুরু করা সম্ভব নয় বলেও সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

কুতুপালং ক্যাম্পের বাসিন্দা রুহুল আমিন বলেন, পরিবার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ক্যাম্পে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তিনি। প্রতি ঈদেই দেশে ফেরার প্রত্যাশা জাগলেও তা পূরণ হচ্ছে না। একই ধরনের হতাশার কথা জানিয়েছেন উখিয়ার লম্বাশিয়া ক্যাম্পের বাসিন্দা হামিদ। তিনি বলেন, মিয়ানমারে জমিজমা ও গবাদিপশুসহ স্বাভাবিক জীবন ছিল। বর্তমানে সীমিত পরিসরের অস্থায়ী আশ্রয়ে পরিবার নিয়ে বসবাস করতে হচ্ছে।

কক্সবাজার নাগরিক ফোরামের সভাপতি আ ন ম হেলাল উদ্দিন বলেন, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন। দীর্ঘমেয়াদি এই সংকট শুধু রোহিঙ্গাদের জন্য নয়, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপরও সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে।

অন্যদিকে রোহিঙ্গা কমিটি ফর পিস অ্যান্ড রিপ্যাট্রিয়েশনের সভাপতি মাস্টার দিল মোহাম্মদ বলেন, অতীতে বাংলাদেশ বিভিন্ন সময়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে সফল উদ্যোগ নিয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতেও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও কার্যকর কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে দীর্ঘদিনের এই সমস্যার সমাধান সম্ভব বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সামরিক অভিযান শুরুর পর সবচেয়ে বড় রোহিঙ্গা ঢল বাংলাদেশে আসে। এরপর প্রায় নয় বছর অতিবাহিত হলেও নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি না হওয়ায় সংকটের স্থায়ী সমাধান এখনো অধরাই রয়ে গেছে। ফলে প্রতি ঈদের মতো এবারও লাখো রোহিঙ্গাকে নিজভূমি থেকে দূরে, অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রেই উৎসব পালন করতে হচ্ছে।



banner close
banner close