জন্মনিবন্ধন থেকে মৃত্যুসনদ, পাসপোর্ট থেকে জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধন, ভূমি অফিস থেকে হাসপাতালের বেড বরাদ্দ—প্রায় প্রতিটি নাগরিক সেবার ক্ষেত্রেই ঘুষ ও দালালচক্রের দৌরাত্ম্যে অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষ। নির্ধারিত সরকারি ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ না করলে কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। ফলে নাগরিকের মৌলিক ও আইনি অধিকার ভোগান্তি ও দুর্নীতির এক চক্রে বন্দি হয়ে পড়েছে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বিভিন্ন সরকারি ও আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠানে ‘টাকা ছাড়া ফাইল নড়ে না’—এমন এক অলিখিত সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। জন্মনিবন্ধন, মৃত্যুসনদ, ওয়ারিশ সনদ, পাসপোর্ট, এনআইডি সংশোধন, ড্রাইভিং লাইসেন্স, জমির নামজারি, দলিল নিবন্ধন কিংবা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা পেতেও অনেক ক্ষেত্রে বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
পাসপোর্ট সেবায় দালাল নির্ভরতা
সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, পাসপোর্টের আবেদন জমা দেওয়া কিংবা তথ্য সংশোধনের ক্ষেত্রে অনেক সময় অযৌক্তিক জটিলতা সৃষ্টি করা হয়। আবেদনপত্রে সামান্য ত্রুটি দেখিয়ে একাধিকবার সংশোধনের জন্য ফেরত দেওয়া হয়। এতে ভোগান্তি এড়াতে অনেকেই দালালের শরণাপন্ন হন।
যাত্রাবাড়ী আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে সেবা নিতে আসা কয়েকজন নাগরিক অভিযোগ করেন, দালালের সহায়তা ছাড়া আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা কঠিন হয়ে পড়ে। একাধিক ভুক্তভোগীর দাবি, নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ প্রদান করলে দ্রুত সমাধান পাওয়া যায়।
হাসপাতালেও অভিযোগ
সরকারি হাসপাতালগুলোতেও রোগী ও স্বজনদের নানা ধরনের অনিয়মের মুখোমুখি হতে হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বেড বরাদ্দ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, অপারেশনের সিরিয়াল কিংবা অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থাপনায় অনৈতিক অর্থ লেনদেনের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। রোগীর স্বজনদের ভাষ্য, অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্থ না দিলে কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
ভূমি ও রেজিস্ট্রি অফিসে ‘উপরি’ ছাড়া কাজ নয়
ভূমি অফিস, সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয় ও রেজিস্ট্রি অফিসগুলোতেও একই চিত্র দেখা যায় বলে অভিযোগ। জমির নামজারি, খতিয়ান সংশোধন, পর্চা উত্তোলন কিংবা দলিল নিবন্ধনের ক্ষেত্রে সরকারি ফি ছাড়াও অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হয়।
তেজগাঁও ভূমি রেজিস্ট্রি অফিসে সেবা নিতে যাওয়া এক ভুক্তভোগী জানান, নির্ধারিত ফি পরিশোধের পরও অতিরিক্ত অর্থের দাবি করা হয়। পরে মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ দেওয়ার পর তার কাজ সম্পন্ন হয়।
জন্মনিবন্ধনেও ভোগান্তি
একটি শিশুর জন্মের পর প্রথম রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি হিসেবে জন্মনিবন্ধন সনদ সংগ্রহ করতে গিয়েও অনেককে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে বলে অভিযোগ। বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের কিছু কার্যালয়ে নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হয়। টাকা না দিলে আবেদন দীর্ঘদিন ঝুলে থাকে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মহাখালী আঞ্চলিক অফিসে সেবা নিতে আসা কয়েকজন নাগরিক অভিযোগ করেন, স্বাভাবিক সময়ে কাজ না হলেও মধ্যস্থতাকারীর সহায়তায় দ্রুত সেবা পাওয়া যায়। ভুক্তভোগীদের মতে, সামান্য ভুল সংশোধনের জন্যও মাসের পর মাস ঘুরতে হয়।
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতেও অনিয়মের অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, অবিবাহিত, বিধবা বা বিপত্নীক সনদ, বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, মুক্তিযোদ্ধা ভাতা, ভিজিডি-ভিজিএফ কার্ড, কাবিখা প্রকল্প, ই-নামজারি, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের ঋণ সহায়তা এবং বিভিন্ন সামাজিক সেবার ক্ষেত্রেও অনৈতিক অর্থ লেনদেনের ঘটনা ঘটে। ফলে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের অনেকেই কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হন।
কঠোর ব্যবস্থা চাইলেন বিশেষজ্ঞরা
দুর্নীতি ও ঘুষ বাণিজ্য বন্ধে জড়িতদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।
তিনি বলেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের সুস্পষ্ট অবস্থান থাকলেও বাস্তবে ঘুষ ও চাঁদাবাজি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। ঘুষ বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না হওয়ায় অনিয়ম অব্যাহত রয়েছে। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে কঠোর বার্তা ও বাস্তব পদক্ষেপ প্রয়োজন বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, নাগরিক সেবা পেতে ঘুষ দিতে হবে—এমন সংস্কৃতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি নাগরিকদেরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
ঘুষমুক্ত সেবা এখনো অধরা
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি সেবার ডিজিটালাইজেশন ও প্রশাসনিক সংস্কারের নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ে অনেক ক্ষেত্রে দালালচক্র ও অসাধু কর্মকর্তাদের প্রভাব এখনো রয়ে গেছে। ফলে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত নাগরিক জীবনের প্রায় প্রতিটি ধাপে ঘুষ ও অনিয়মের অভিযোগ শুনতে হচ্ছে।
তাদের মতে, কার্যকর নজরদারি, জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ, সেবা প্রক্রিয়ার পূর্ণ ডিজিটালাইজেশন এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ছাড়া এই পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব নয়। ততদিন পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জন্য সরকারি সেবা গ্রহণ একটি দুর্ভোগের নাম হয়েই থাকবে।
আরও পড়ুন:








