হত্যা মামলার তদন্তে সরকারি বরাদ্দ মাত্র ছয় হাজার টাকা, অথচ বাস্তব খরচ পঞ্চাশ হাজার পর্যন্ত। লাশ উদ্ধার থেকে আসামি গ্রেপ্তার পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে নিজের পকেট থেকে অর্থ ব্যয় করতে বাধ্য হন পুলিশের তদন্তকারী কর্মকর্তারা। অবাস্তব বরাদ্দ, সোর্স মানির অপ্রতুলতা এবং যানবাহন সংকটের এই কাঠামোগত ফাঁদেই মূলত লুকিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ পুলিশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়া ঘুস ও দুর্নীতির কারণ।
গত ১৭ মে তুরাগ নদ থেকে একটি অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করে নৌপুলিশ। লাশটি নদী থেকে তুলতে ডোম ভাড়া বাবদ তিন হাজার, অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া চার হাজার এবং মর্গের ডোমকে আরও এক হাজার টাকা দিতে হয় দায়িত্বে থাকা উপপরিদর্শককে (এসআই)। মোট আট হাজার টাকা ব্যয় হলেও এই খাতে পুলিশের কোনো বরাদ্দ নেই।
ওই এসআই জানান, গত এক বছরে এমন বেশ কয়েকটি লাশের ব্যবস্থাপনা তাকে করতে হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে খরচ পনের হাজার টাকা পর্যন্ত গেছে। মাত্র পঁয়তাল্লিশ থেকে ছেচল্লিশ হাজার টাকা বেতনে চাকরি টিকিয়ে রাখতে বাধ্য হয়ে টাকা ম্যানেজ করতে হয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বরাদ্দ ও বাস্তব খরচের আকাশ-পাতাল ব্যবধান
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের ২০২১ সালের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, হত্যা ও ডাকাতি মামলার তদন্তে সর্বোচ্চ বরাদ্দ ছয় হাজার টাকা। অপহরণ বা মানব পাচার মামলায় পাঁচ হাজার, দস্যুতা ও অপমৃত্যু মামলায় চার হাজার এবং মাদক, নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায় মাত্র দুই হাজার টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
তদন্তকারী কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, হত্যা মামলার প্রকৃত তদন্ত ব্যয় পঞ্চাশ হাজার, অপহরণ মামলায় বিশ থেকে ত্রিশ হাজার এবং মানি লন্ডারিং মামলায় বিশ থেকে পঁচিশ হাজার টাকা পর্যন্ত পৌঁছায়। অর্থাৎ বরাদ্দের তুলনায় বাস্তব খরচ দুই থেকে দশগুণ পর্যন্ত বেশি। এই বাড়তি অর্থ ম্যানেজ করতে হয় তদন্ত কর্মকর্তাকে নিজেই।
ঢাকার বাইরে অভিযানে গেলে দশ হাজার টাকা খরচ হলেও বিল মেলে চার হাজারের বেশি নয় বলে জানিয়েছেন একাধিক এসআই। অনেক সময় তাও মেলে না। এ কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাদীর কাছ থেকে গাড়ি ভাড়াসহ বিভিন্ন খরচ আদায় করা হয়।
সোর্স মানি যায় সিনিয়রদের পকেটে
মাঠপর্যায়ে অপরাধী শনাক্তে সোর্স নিয়োগ করতে হয় এসআই পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের। এই খাতে পুলিশে সোর্স মানির প্রচলন থাকলেও মাঠকর্মীরা তা পান না। পুলিশের একাধিক সদস্য জানিয়েছেন, এই খাতের বরাদ্দ সিনিয়রদের পকেটে চলে যায়। ফলে অনেক কর্মকর্তা নিজের টাকায় সোর্স নিয়োগ করতে গিয়ে দুর্নীতির পথে অর্থ সংগ্রহ করতে বাধ্য হন।
গাড়ির সংকটে টহলও থমকে থাকে
দেশের অধিকাংশ থানায় যানবাহনের তীব্র সংকট রয়েছে। মানিকগঞ্জ সদর থানার একজন কর্মকর্তা জানান, রাতে নয়টি টহল দল মাঠে থাকে, কিন্তু থানায় গাড়ি আছে মাত্র তিনটি। বাকি সাতটি দলের যানবাহন নিজেদের ম্যানেজ করতে হয়।
পদায়ন বাণিজ্যে মূল দুর্নীতির শিকড়
বিভিন্ন মহলের অভিযোগ, পুলিশে ভালো পদায়ন পেতে বড় অঙ্কের ঘুস দিতে হয়। জেলার পুলিশ সুপার পদে কয়েক কোটি, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পদে বিশ থেকে ত্রিশ লাখ, এসআই পদে দুই থেকে আড়াই লাখ এবং কনস্টেবল পদায়নে পঞ্চাশ হাজার থেকে এক লাখ টাকা লাগে বলে অভিযোগ রয়েছে।
গত বছর নরসিংদীর পুলিশ সুপার পদে পদায়ন পেতে পঞ্চাশ লাখ টাকা ঘুস দেওয়ার অভিযোগে এক এসপির বিরুদ্ধে তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলেও তাকে শুধু তিরস্কার দণ্ড দেওয়া হয়েছে। এই শাস্তির লঘুতা পুলিশের দুর্নীতি প্রতিরোধের দুর্বলতাকেই প্রকাশ করে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সাধারণ মানুষের আস্থা তলানিতে
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, পুলিশি সেবা পেতে প্রায় ৬২ শতাংশ মানুষ ঘুস দিতে বাধ্য হয়েছেন। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) জরিপ অনুযায়ী, পুলিশ সেবায় ৭৪ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ দুর্নীতির মুখোমুখি হয়েছেন এবং ঘুস দিয়েছেন ৫৮ শতাংশ।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, পুলিশের সেবাদান পর্যায়ে যে অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা রয়েছে তা নগণ্য, অনেক ক্ষেত্রে শূন্য। এ কারণেই পুলিশ বাধ্য হয়ে অনিয়ম-দুর্নীতির দিকে ঝোঁকে। পুলিশ সার্ভিসের উন্নয়নে কখনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছিল না, এটি তারই প্রতিফলন। সরকার যদি এই বিষয়গুলো বিবেচনায় না নেয়, সমস্যা চিরকাল জিইয়ে থাকবে বলে তিনি সতর্ক করেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন এক অনুষ্ঠানে বলেন, পুলিশের কাছে যোগাযোগের সুবিধা নেই, একটি গাড়িও নেই দ্রুত কোথাও যাওয়ার। তখন সে অভিযোগকারীকে বলে সিএনজির ভাড়া দিতে। গ্রামাঞ্চলে এটাই বাস্তবতা। পুলিশকে পুলিশের মতো না রাখলে মনোবলও সেই পর্যায়ে থাকবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সংস্কারের দাবি বিশেষজ্ঞদের
সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক আব্দুল কাইয়ুম বলেন, পুলিশকে সৎ ও দক্ষ রাখতে হলে আর্থিক সংকট দূর করতে হবে। থানার তদন্ত কর্মকর্তাদের প্রকৃত খরচের সমপরিমাণ অর্থ দেওয়া উচিত। সোর্স মানির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে এবং উচ্চপদের বরাদ্দ কমিয়ে মাঠপর্যায়ে তা বাড়ানো উচিত। সরকারের বাজেটও বৃদ্ধি করা প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে পুলিশে যোগ দেওয়া একজন এসআই বলেন, শুরুতে বেতনের বাইরে কোনো টাকা নিইনি, সততার সঙ্গে চাকরি করার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু বিভাগীয় সিস্টেম দেখতে দেখতে আস্তে আস্তে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। তাঁর এই স্বীকারোক্তি পুলিশের কাঠামোগত সমস্যার গভীরতাকেই তুলে ধরে।
আরও পড়ুন:







.jpg)
