সোমবার

১৮ মে, ২০২৬ ৪ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

নাগরিকত্ব ত্যাগের নতুন আবেদন করেছেন এস আলম, সরকার সতর্ক অবস্থানে

স্টাফ রিপোর্টার

প্রকাশিত: ১৮ মে, ২০২৬ ১২:০০

শেয়ার

নাগরিকত্ব ত্যাগের নতুন আবেদন করেছেন এস আলম, সরকার সতর্ক অবস্থানে
ছবি সংগৃহীত

এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ত্যাগে নতুন করে আবেদন করেছেন। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে নিজের, স্ত্রী ফারজানা পারভীন এবং দুই ছেলে আশরাফুল আলম ও আসাদুল আলম মাহিরের নাগরিকত্ব পরিত্যাগের এই আবেদন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দাখিল করা হয়। তবে চলমান আইনি ও আর্থিক জটিলতার কারণে সরকার আপাতত এই আবেদন মঞ্জুর না করার পক্ষে রয়েছে।

সরকারের উদ্বেগ দুটি বড় ক্ষেত্রে

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আবেদন পর্যালোচনায় সরকার দুটি প্রধান ঝুঁকি চিহ্নিত করেছে। প্রথমত, সাইফুল আলমের বিরুদ্ধে বিদেশে বিপুল অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে। নাগরিকত্ব পরিত্যাগের আবেদন মঞ্জুর হলে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার আইনি প্রক্রিয়া জটিল হয়ে পড়তে পারে। দ্বিতীয়ত, সাইফুল আলম নিজের সম্পদ সুরক্ষার দাবি তুলে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সালিসি আদালতে মামলা করেছেন। নাগরিকত্বের প্রশ্নে তাঁর অবস্থান শক্তিশালী হলে ওই মামলায় বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

মতামত চেয়ে সাত সংস্থায় চিঠি

গত ৩ এপ্রিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সাইফুল আলম পরিবারের নাগরিকত্ব পরিত্যাগের আবেদন বিষয়ে মতামত চেয়ে সরকারের সাতটি সংস্থায় চিঠি দিয়েছে। এগুলো হলো দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), নির্বাচন কমিশন, ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট, পুলিশের বিশেষ শাখা, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা এবং প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, এখনো সব সংস্থার প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি। প্রতিবেদন পাওয়ার পর সরকার পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে।

আগের আবেদন ঘিরে আইনি জটিলতা

২০২০ সালেও বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন করেছিলেন সাইফুল আলম। তাঁর আইনজীবীদের দাবি, সাইপ্রাসের নাগরিকত্ব গ্রহণের কারণ দেখিয়ে করা ওই আবেদন তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার মঞ্জুর করেছিল। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের ২০২০ সালের ১৯ জুলাইয়ের একটি স্মারক তার প্রমাণ হিসেবে দেখানো হয়।

তবে ওই সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে গত বছরের নভেম্বরে হাইকোর্টে রিট আবেদন করে ইসলামী ব্যাংক। এর পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট আওয়ামী লীগ সরকার আমলে দেওয়া সেই স্মারকটি স্থগিত করেন। ফলে সাইফুল আলমের নাগরিকত্বের প্রশ্নটি এখনো অমীমাংসিত রয়েছে।

কোন দেশের নাগরিক, তা নিয়েও ধোঁয়াশা

সাইফুল আলম আসলে কোন দেশের নাগরিক, সে প্রশ্নও নতুন করে সামনে এসেছে। ২০২০ সালে তিনি সাইপ্রাসের নাগরিকত্ব গ্রহণের কথা বলে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন করেছিলেন। অথচ গত অক্টোবরে আন্তর্জাতিক সালিসি আদালতে মামলা করেছেন সিঙ্গাপুরের নাগরিক দাবি করে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে থাকা নথি অনুযায়ী, ২০১৬ সালে সাইফুল আলমের নামে সাইপ্রাসের পাসপোর্ট ইস্যু হয়েছিল। মন্ত্রণালয়ের ২০২০ সালের ৬ আগস্টের একটি নথিতে উল্লেখ আছে, সাইফুল আলম, তাঁর স্ত্রী ও দুই ছেলে সাইপ্রাসের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছেন।

অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক সালিসি মামলার আইনি নথিতে দাবি করা হয়েছে, এস আলম পরিবারের সদস্যরা ২০২০ সালে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ত্যাগ করার পর ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে সিঙ্গাপুরের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছেন। তবে সিঙ্গাপুরের নাগরিকত্ব নিতে হলে সাধারণত অন্য দেশের নাগরিকত্ব ত্যাগ করতে হয়। সে ক্ষেত্রে সাইপ্রাসের নাগরিকত্ব তিনি কবে বাতিল করেছেন এবং কবে সিঙ্গাপুরের নাগরিক হয়েছেন, সে-সংক্রান্ত কোনো তথ্য বাংলাদেশ সরকারের কাছে নেই।

আন্তর্জাতিক সালিসি মামলায় লড়বে সরকার

গত অক্টোবরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ বিরোধ নিষ্পত্তি কেন্দ্রে মামলা করেন সাইফুল আলম। মামলাটি করা হয়েছে ২০০৪ সালে বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের মধ্যে স্বাক্ষরিত দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগ চুক্তির আওতায়। আগামী ২২ জুন যুক্তরাষ্ট্রে এই মামলার শুনানি রয়েছে।

মামলার আবেদনে এস আলম পরিবার অভিযোগ করেছে, অন্তর্বর্তী সরকার পরিকল্পিতভাবে তাদের ব্যাংক হিসাব জব্দ, সম্পদ বাজেয়াপ্ত এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রমে তদন্ত চালিয়ে শত শত কোটি ডলারের ক্ষতি করেছে, যা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ চুক্তির পরিপন্থী।

বর্তমান সরকার মামলাটি আইনিভাবে মোকাবিলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ জন্য গত ৩ ফেব্রুয়ারি সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠকে একটি ব্রিটিশ আইনি প্রতিষ্ঠান নিয়োগ এবং প্রয়োজনীয় অর্থ ব্যয়ের অনুমোদন দেওয়া হয়।

স্বরাষ্ট্রসচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী বলেছেন, সরকার এ মামলায় লড়তে সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

শুনানির প্রস্তুতির অংশ হিসেবে গত ১২ মে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় থেকে ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরে সাইফুল আলমের জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্টের সর্বশেষ অবস্থা জানতে চিঠি দেওয়া হয়। ১৩ মে অধিদপ্তর জানায়, সাইফুল আলম, তাঁর স্ত্রী ও ছেলে আসাদুল আলম মাহিরের পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হলেও সেগুলো এখনো সক্রিয় রয়েছে। তবে আরেক ছেলে আশরাফুল আলমের পাসপোর্টের কোনো তথ্য অধিদপ্তরের ডেটাবেজে নেই।

আইনজীবীর প্রশ্ন

ইসলামী ব্যাংকের রিটের পক্ষে আইনজীবী এম আবদুল কাইয়ূম বলেছেন, সাইফুল আলম ২০২০ সালে নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন বলে দাবি করলে প্রশ্ন ওঠে, কীভাবে তিনি ২০২৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে বিভিন্ন কোম্পানির নামে ব্যাংকঋণ নিয়েছেন। গত বছর চট্টগ্রামে ইসলামী ব্যাংকের বিরুদ্ধে করা মামলায় সাইফুল আলম নিজেকে বাংলাদেশের নাগরিক দাবি করেছিলেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন। সুপ্রিম কোর্টের এই জ্যেষ্ঠ আইনজীবীর মতে, এখন নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন করা হচ্ছে মূলত বিদেশে নিয়ে যাওয়া অর্থ ফেরত দেওয়ার দায় এড়াতে এবং সিঙ্গাপুরের নাগরিক হিসেবে আন্তর্জাতিক সুরক্ষা দাবি করতে।

পাচারের অভিযোগ ও তদন্ত

২০২৪ সালের নভেম্বরে ব্রিটিশ সংবাদপত্র ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর আহসান এইচ মনসুর জানিয়েছিলেন, শেখ হাসিনা সরকার আমলে এস আলম গোষ্ঠী বাংলাদেশ থেকে এক লাখ বিশ হাজার কোটি টাকা পাচার করেছে।

এস আলমের সম্পদ বিষয়ে অনুসন্ধান করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। ইসলামী ব্যাংকের ঋণ অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করছে দুদক, যারা ইতিমধ্যে এস আলমসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে পৃথক তিনটি অভিযোগপত্র দাখিলের অনুমতি দিয়েছে।

আওয়ামী লীগ সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে ব্যাংক দখল, ঋণ অনিয়ম ও অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে সাইফুল আলমের বিরুদ্ধে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে তিনি ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা বিদেশে অবস্থান করছেন এবং দেশে ফেরেননি।

বক্তব্য জানতে সাইফুল আলমের ফোনে একাধিকবার কল করা হয় এবং এস আলম গ্রুপের ওয়েবসাইটে পাওয়া ই-মেইলেও যোগাযোগ করা হয়, কিন্তু কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।



banner close
banner close