সোমবার

১৮ মে, ২০২৬ ৪ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

১৬২ সীমান্ত পয়েন্টে মাদকের ঢল, সক্রিয় ১৬০০ গডফাদার

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৮ মে, ২০২৬ ০৮:১৪

শেয়ার

১৬২ সীমান্ত পয়েন্টে মাদকের ঢল, সক্রিয় ১৬০০ গডফাদার
ছবি সংগৃহীত

দেশব্যাপী সরকার ঘোষিত মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযান শুরুর ১৭ দিন পার হলেও মাদক নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে কিছু খুচরা বিক্রেতা ও বাহক গ্রেপ্তার হলেও শীর্ষ পর্যায়ের গডফাদাররা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন। গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, দেশের সীমান্তবর্তী ২৯ জেলার ১৬২টি পয়েন্ট দিয়ে অব্যাহতভাবে দেশে প্রবেশ করছে বিভিন্ন ধরনের মাদক। সক্রিয় রয়েছে অন্তত ১ হাজার ৬০০ গডফাদার ও প্রায় ২১ হাজার সদস্যের একটি মাদক নেটওয়ার্ক।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা কমে যাওয়ার সুযোগে মাদক কারবারিরা শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করে। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ইয়াবা, ফেনসিডিল, গাঁজা, হেরোইন, আইস, কেটামিন ও ট্যাপেন্টাডলসহ বিভিন্ন মাদকের সরবরাহ বেড়েছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনায় সবচেয়ে বেশি সক্রিয় রয়েছে এসব চক্র।

পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, বিশেষ অভিযান আরও জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মাদকের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ জেলাগুলোতে বিশেষ নির্দেশনা পাঠিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। সীমান্তে কঠোর নজরদারি বজায় রাখতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশকে শুরু থেকেই নির্দেশনা দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, কারবারিদের কৌশল ও ছদ্মবেশ এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে নিজেদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি না হলে সহজে তাদের শনাক্ত করা যাচ্ছে না। এতে মাদকের বিস্তার আরও জটিল আকার ধারণ করছে।

অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, কার্যকর সমন্বিত উদ্যোগ ও বাস্তবভিত্তিক জিরো টলারেন্স নীতি ছাড়া মাদক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। সীমান্তে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার বিষয়েও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিচালক (অপারেশন্স) মো. বশির আহমেদ বলেন, সরকার ঘোষিত বিশেষ অভিযানের অংশ হিসেবে সারা দেশে নিয়মিত অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। ইতোমধ্যে বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার ও অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়নে সংস্থাটি কাজ করছে।

ডিএনসির অতিরিক্ত পরিচালক এ কে এম শওকত ইসলাম জানান, লাইসেন্সপ্রাপ্ত বার ও সিসা লাউঞ্জেও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। ঢাকামুখী মাদক ট্রানজিট রুটে গোয়েন্দা তৎপরতাও জোরদার করা হয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, অভিযানে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করে গডফাদারদের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। বিশেষ এলাকাগুলোতে মাদকবিরোধী কার্যক্রম আরও কঠোর করা হয়েছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে ২ কোটি ২৮ লাখ ৫৭ হাজার ৭৫১ পিস ইয়াবা উদ্ধার হলেও গত বছর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ কোটি ৩৫ লাখ ৬২ হাজার ৮১১ পিসে। একই সময়ে ১৬৬ কেজি হেরোইন, সাড়ে ১৪ কেজি কোকেন, ৯৬ হাজার ৩৫৭ কেজি গাঁজা এবং ৩ লাখ ১৯ হাজার ৯৪০ বোতল ফেনসিডিল জব্দ করা হয়েছে।

ডিএনসির তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ২ কেজি ৮৪৭ গ্রাম আইস, ৭০ কেজি সিসা, সাড়ে ৬ কেজি কেটামিন, ৫ দশমিক ৪৬ কেজি গাঁজার কুশ এবং ১ লাখ ২০ হাজার ৭৫৪ পিস ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কয়েক বছর আগেও এসব নতুন ধরনের মাদকের বিস্তার এতটা ছিল না।

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, ভারত ও মিয়ানমার সীমান্তঘেঁষা প্রায় সব জেলাই এখন মাদক প্রবেশের রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। কক্সবাজার সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা ও হেরোইনের চালান বাড়ছে। রোহিঙ্গা চক্রের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও রয়েছে।

দিনাজপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, ঠাকুরগাঁও, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, যশোর, সাতক্ষীরা, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে মূলত ফেনসিডিল প্রবেশ করছে। অন্যদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ, শেরপুর ও নেত্রকোনার সীমান্তপথ দিয়ে গাঁজা প্রবেশ করছে। বিদেশি মদের চালানও বাড়ছে বিভিন্ন সীমান্ত জেলায়।

বিভিন্ন জেলার প্রতিনিধিদের তথ্যে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি। বগুড়া, চট্টগ্রাম, হবিগঞ্জ, নড়াইল, পটুয়াখালী, রাজবাড়ী ও রংপুরে মাদক কারবার ও সেবন বৃদ্ধি পাওয়ার অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। প্রশাসনের দুর্বলতা, নজরদারির ঘাটতি, সীমান্তপথের ব্যবহার এবং সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটের তৎপরতার কারণে পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে বলে দাবি তাদের।

চট্টগ্রামে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পুলিশের চেকপোস্ট ও ব্লক রেইড কার্যক্রম কমে যাওয়ায় মাদক পাচার বেড়েছে। পটুয়াখালীর কুয়াকাটা উপকূলকে মাদক কারবারিদের নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। সেখানে ইয়াবার পাশাপাশি ক্রিস্টাল মেথের বিস্তারের তথ্য পাওয়া গেছে।

রংপুরে সীমান্ত এলাকা ব্যবহার করে মাদক পাচার বৃদ্ধি পাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সচেতন মহল। একইভাবে রাজবাড়ী, নড়াইল ও হবিগঞ্জে মাদকাসক্তি ও সংশ্লিষ্ট অপরাধ বাড়ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।



banner close
banner close