সিলেট সদর উপজেলার কান্দিগাঁওয়ের সোনাতলা গ্রামে চার বছরের শিশু ফাহিমা আক্তারের নিথর দেহ যখন পুকুরপাড়ে পড়ে থাকে, তখন কেবল একটি পরিবারের স্বপ্নই মরে না; আমাদের সমাজের কদর্য কঙ্কালটি উন্মোচিত হয়। খুনি জাকির গ্রেপ্তার হয়েছে, চারদিকে ক্ষোভের আগুন। গতকালই ফাহিমা হত্যার প্রতিবাদে ও বিচারের দাবিতে এক বিশাল মানববন্ধন হয়ে গেল। যেখানে দল-মত ভুলে সর্বস্তরের রাজনৈতিক নেতা-কর্মী আর সাধারণ মানুষ এক হয়ে রাজপথে নেমে এসেছেন। এর আগেই অবশ্য ক্ষুব্ধ জনতা খুনি জাকিরের বাড়িঘর ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে নিজেদের ভেতরের জমে থাকা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ইট-পাথরের দেয়াল ভাঙলেই কি ফাহিমার পরিবারের ভেতরের ভাঙন জোড়া লাগবে?
ফাহিমার বাবা একজন বাক-প্রতিবন্ধী মানুষ। মুখ ফুটে যে মানুষটি নিজের কষ্টের কথা কাউকে বলতে পারেন না, আজ তাঁর বুকফাটা আর্তনাদে সোনাতলার আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠছে। এই তীব্র শোকের মাতমে পরিবারটির রুজি-রোজগার সম্পূর্ণ বন্ধ। ঘরে চাল নেই, চুলা জ্বলছে না; এক বুক পাহাড়সম কষ্ট আর চরম অনাহারে-অভাবে দিন কাটছে ফাহিমার হতভাগা পরিবারের। আজই একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, ফুটফুটে মেয়ে হারানো এই অসহায় পরিবারটি দুমুঠো অন্নের জন্য, বেঁচে থাকার জন্য জনতার কাছে হাত পাতছে, আর্থিক সাহায্য চাইছে। একটি স্বাধীন সমাজে এর চেয়ে লজ্জাজনক আর হৃদয়বিদারক দৃশ্য আর কী হতে পারে?
ফাহিমা হত্যার বিচার চাওয়া যতটা জরুরি, আজ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের প্রশ্ন করাও ততটাই প্রয়োজন। আমরা কি সেই সমাজ নই, যেখানে চোখের সামনে মাদক কারবারিরা বুক ফুলিয়ে ঘোরে? আমরা কি সেই প্রতিবেশী নই, যারা জেনেও 'ঝামেলা এড়াতে' কিংবা 'ব্যক্তিগত খাতিরে' ইয়াবার আসর দেখেও না দেখার ভান করি? কিংবা 'নিজের দলের ছেলে' বলে রাজনৈতিক ছত্রছায়া দিই?
আপনি যখন একজন মাদকাসক্ত বা কারবারিকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন, তখন আপনি আসলে নিজ হাতে একেকজন 'জাকির' তৈরি করছেন। যে নেশার টাকার জন্য ফাহিমাদের মতো শিশুদের প্রাণ কেড়ে নিতে দ্বিধা করে না। ফাহিমা হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে মাদকের প্রভাব সূর্যের আলোর মতো স্পষ্ট। আজ ফাহিমার জন্য আমরা রাজপথে মিছিল করছি, কিন্তু মিছিল শেষে যখন আবার সেই মাদকাসক্ত 'বড় ভাই'য়ের সাথে চায়ের আড্ডায় বসি, তখন ফাহিমার আত্মা আমাদের উপহাস করে। আজ যে মাদক ব্যবসায়ী অন্যের সন্তানের জান নিল, কাল সে আপনার ঘরের দরজায় কড়া নাড়বে না—এই গ্যারান্টি কে দেবে?
এবার একটু প্রশাসনের ভূমিকার দিকে তাকানো যাক। এলাকাবাসীর অভিযোগ, জালালাবাদ থানার চারপাশের এলাকা আজ মাদকের বিষবাষ্পে আচ্ছন্ন। থানা থেকে সোনাতলা গ্রামের দূরত্ব বড়জোর এক কিলোমিটার। এই সামান্য দূরত্বের মধ্যে কীভাবে দিনের পর দিন মাদকের রমরমা কারবার চলে, আর নিষ্পাপ শিশু প্রাণ হারায়? পুলিশ এই দায় এড়াতে পারে না। ফাহিমা লাশ হওয়ার পর পুলিশ তৎপর হয়েছে। কিন্তু এই বজ্রমুষ্টি কি প্রাণটা যাওয়ার আগে দেখানো যেত না? মাদক ব্যবসায়ীদের আস্তানা যদি আগেই গুঁড়িয়ে দেয়া হতো, তবে আজ ফাহিমার বাক-প্রতিবন্ধী বাবাকে মেয়ের জানাজা পড়তে হতো না, আজ তাঁদের এভাবে অনাহারে পথে বসতে হতো না।
আরেকটি চেনা অসুখ হলো রাজনৈতিক প্রশ্রয়। ভোটের রাজনীতি বা এলাকায় দাপট ধরে রাখতে গিয়ে অনেক সময় স্থানীয় নেতারা জেনেশুনে এই মাদকাসক্ত ও বখাটেদের 'ছোট ভাই' বানিয়ে মাথায় তোলেন। অপরাধীরা যখন রাজনৈতিক শেল্টার পায়, তখন তারা আইনকে তোয়াক্কা করে না। ফাহিমার মৃত্যু স্থানীয় রাজনীতিকদের জন্য বড় পরীক্ষা—তারা মাদকের বিরুদ্ধে অটল থাকবেন, নাকি ভোটের রাজনীতিতে হারিয়ে যাবেন?
পরিশেষে স্পষ্ট কথা—ফাহিমা হত্যার দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই। কিন্তু তার পাশাপাশি মাদক মুক্ত সমাজ গড়ার শপথ নিতে হবে আজই। ইয়াবা বিক্রেতা ও সেবনকারীদের সামাজিকভাবে বয়কট করুন এবং এই মুহূর্তে ফাহিমার অবহেলিত, অনাহারী পরিবারটির পাশে দাঁড়ানো আমাদের মানবিক দায়িত্ব। একজন সচেতন অভিভাবক বা তরুণ হিসেবে সিদ্ধান্ত আপনার—হয় মাদককে বেছে নিন, নয়তো আপনার সন্তানের নিরাপত্তা। দুই নৌকায় পা দিয়ে আর যাই হোক, ফাহিমাদের রক্তঋণ শোধ করা সম্ভব নয়।
আরও পড়ুন:








