শুক্রবার

১৫ মে, ২০২৬ ১ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

সীমান্তবর্তী পশুর হাটে ভারতীয় গরুর বাণিজ্য, ক্ষতির আশঙ্কায় হাওরাঞ্চলের খামারিরা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৫ মে, ২০২৬ ১২:২৩

শেয়ার

সীমান্তবর্তী পশুর হাটে ভারতীয় গরুর বাণিজ্য, ক্ষতির আশঙ্কায় হাওরাঞ্চলের খামারিরা
ছবি সংগৃহীত

কোরবানির ঈদ সামনে রেখে সীমান্তবর্তী এলাকায় পশুর হাট ইজারা না দেওয়ার সরকারি ঘোষণা থাকলেও সুনামগঞ্জের বিভিন্ন সীমান্তঘেঁষা পশুর হাটে ভারতীয় গরুর অবাধ বেচাকেনার অভিযোগ উঠেছে। জেলার মধ্যনগরের মহিষখলা বাজার ও দোয়ারাবাজারের বোগলাবাজারে ভারতীয় গরুর রমরমা বাণিজ্যের কারণে দেশীয় খামারি ও কৃষকেরা আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন। হাওরাঞ্চলে ফসলহানির কারণে গবাদিপশুর খাদ্যসংকট তৈরি হওয়ায় অনেক কৃষক কম দামে গরু বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে অতিবৃষ্টি ও আগাম বন্যায় হাওরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকার ধান তলিয়ে গেছে। পানিতে খড় নষ্ট হওয়ায় গবাদিপশুর খাদ্যসংকট দেখা দিয়েছে। ফলে কৃষকেরা গোয়ালের গরু বিক্রির জন্য বাজার ও পাইকারদের কাছে ছুটছেন। এর মধ্যেই সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় গরু প্রবেশ করায় দেশীয় গরুর দাম কমে গেছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় খামারিরা।

দেখার হাওরপারের ইসলামপুর গ্রামের কৃষক মাসুক মিয়া বলেন, তাঁর ছয়টি গরু ছিল। এর মধ্যে ৬০ হাজার টাকার একটি গরু ৪০ হাজার টাকায় বিক্রি করতে হয়েছে। খাদ্যসংকটের কারণে বাকি গরুগুলোও বিক্রি করে দেওয়ার চিন্তা করছেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, কোরবানির ঈদ সামনে রেখে ভারতীয় গরু আসায় দেশীয় গরুর বাজার আরও দুর্বল হয়ে পড়ছে। একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেন স্থানীয় কৃষক আব্দুল অদুদ।

দেশীয় খামারিদের স্বার্থ রক্ষায় প্রাণিসম্পদমন্ত্রী আমিন উর রশিদ গত ৩ মে সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে সীমান্তবর্তী এলাকায় কোনো পশুর হাট ইজারা না দেওয়ার ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, অবৈধভাবে পশু প্রবেশ ঠেকাতে এবং দেশীয় খামারিদের সুরক্ষায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে সুনামগঞ্জে সেই নির্দেশনার বাস্তবায়নের দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই বলে অভিযোগ উঠেছে।

মধ্যনগর উপজেলার সীমান্তঘেঁষা মহিষখলা বাজারে প্রতি মঙ্গলবার নিয়মিত পশুর হাট বসছে। স্থানীয়দের দাবি, কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে ভারত থেকে অবৈধভাবে গরু আনার প্রবণতা বেড়েছে। এসব গরু প্রকাশ্যে বাজারজাত করা হচ্ছে।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর মহিষখলা বাজার ইজারার জন্য এক কোটি ১৬ লাখ ৬২ হাজার ৬৬৮ টাকা বার্ষিক মূল্য নির্ধারণ করে পাঁচবার দরপত্র আহ্বান করা হয়। তবে কোনো দরপত্রদাতা না পাওয়ায় প্রশাসন খাস আদায়ের সিদ্ধান্ত নেয়। পরে ৬১ লাখ ৪০ হাজার টাকায় বাজারটির খাস কালেকশনের দায়িত্ব পান বংশীকুণ্ডা উত্তর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মো. মোক্তার হোসেন।

স্থানীয় খামারিদের অভিযোগ, সীমান্তঘেঁষা অবস্থানের কারণে বাজারটি ভারতীয় গরুর অন্যতম প্রবেশকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এসব গরু স্থানীয় বাজারে এনে বৈধতার সুযোগ দিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হচ্ছে। এ কারণে কোরবানির ঈদ পর্যন্ত বাজারটি বন্ধ রাখার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

তবে বাজারের ইজারাদার মো. মোক্তার হোসেন বলেন, মহিষখলা বাজারে প্রতি মঙ্গলবার নিয়মিত পশুর হাট বসে। এটি আলাদা কোনো কোরবানির হাট নয়। সীমান্তবর্তী এলাকায় পশুর হাট বন্ধ রাখার সরকারি নির্দেশনার বিষয়ে তিনি অবগত নন বলেও জানান। তাঁর দাবি, প্রশাসন থেকেও এ বিষয়ে তাঁকে কিছু জানানো হয়নি।

এদিকে দোয়ারাবাজার উপজেলার বোগলা সীমান্তকেও চোরাচালানের অন্যতম রুট হিসেবে উল্লেখ করছেন স্থানীয়রা। তাঁদের অভিযোগ, ভারতের মেঘালয় সীমান্ত দিয়ে আনা গরুর একটি বড় অংশ প্রথমে বোগলাবাজার এলাকার বিভিন্ন খামারে রাখা হয়। পরে স্থানীয় হাটে তুলে সেগুলো দেশীয় গরু হিসেবে বাজারজাত করা হয়।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, কিছু খামারি ও ইজারাদার এ কাজে জড়িত। প্রতিটি গরু খামারে রাখার জন্য ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। দিনের বেলায় এসব খামারে তেমন কার্যক্রম না থাকলেও রাতে গরু এনে রাখা হয় বলেও জানিয়েছেন তাঁরা।

দোয়ারাবাজার উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আবু হেনা মোস্তফা বলেন, কিছু খামারে অস্থায়ীভাবে গরু রাখার অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

দোয়ারাবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অরুপ রতন সিংহ বলেন, ভোগলা বাজারে ভারতীয় গরু প্রবেশের তথ্য পাওয়া গেছে। বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা সভায় আলোচনা হয়েছে। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তারিকুল ইসলাম বলেন, সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সমর কুমার পাল বলেন, সীমান্তের কিছু হাট আগেই বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছে। কোরবানির ঈদ সামনে রেখে এসব হাট নিয়ে নতুন কোনো সিদ্ধান্ত এখনো পাওয়া যায়নি।



banner close
banner close