ভারত থেকে আনা কথিত ভুয়া এমবিবিএস ডিগ্রি ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসা বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলার কথিত চিকিৎসক ডা. মাহামুদুল হাসানের বিরুদ্ধে। তিনি উপজেলার পাঁচরাস্তা মোড়ে গ্রামীণ জেনারেল হাসপাতালের নিচতলায় চেম্বার খুলে রোগী দেখে আসছেন বলে জানা গেছে।
ব্যবস্থাপত্রে নিজেকে “এমবিবিএস” ও মেডিসিন, শিশু এবং অর্থোপেডিক রোগে অভিজ্ঞ চিকিৎসক হিসেবে পরিচয় দিলেও তার বিএমডিসির বৈধ অনুমোদন নেই বলে নিজে শিকার করছে। পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ), মহাখালী, ঢাকার ডা. আবু হোসেন মো. মউনুল আহসান স্বাক্ষরিত ২০২৫ সালের ১৫ অক্টোবরের এক চিঠিতে তার সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেয় বাগেরহাট সিভিল সার্জন এর কাছে। তবে রহস্যজনক কারণে এখনো কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।
এদিকে দুদকের অভিযানে (২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) সালে তার ব্যবহৃত ডিগ্রি ও কার্যক্রম নিয়ে অভিযোগের সত্যতাও পায় বলে জানা গেছে সংশ্লিষ্ট সূত্রে। অতীতে ভুয়া চিকিৎসক সংক্রান্ত মামলায় ১৯ দিন কারাভোগের পর জামিনে বেরিয়ে পুনরায় চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শরণখোলার এক কথিত সাংবাদিক ভুয়া চিকিৎসকের পক্ষে কাজ করছেন। নামমাত্র একটি অনলাইন পোর্টালে নিয়মিত বিজ্ঞাপন প্রকাশের মাধ্যমে ওই চিকিৎসকের কাছ থেকে প্রতি মাসে প্রায় ১০ হাজার টাকা আদায় করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, এটি মূলত চাঁদাবাজির অভিনব কৌশল।
সোমবার বিকেলে বাগেরহাটে কর্মরত সাংবাদিক মোঃ কামরুজ্জামান, সৈকত মন্ডল, সাগর মন্ডল, রিফাত আল মাহামুদ, রুহুল আমিন বাবু, মোঃ মেহেদী হাসান ডা. মাহামুদুল হাসানের বক্তব্য নিতে গেলে বক্তব্য দিবে না বলে। পরে সাংবাদিকরা বের হওয়ার সময় স্থানীয় কিছু রাজনৈতিক পরিচয়ধারী সেচ্ছাসেবক দলের সাবেক আহবায়ক পরিচয়দানকারী ওষুধ কোম্পানির রিপ্রেজেন্টিভ মোঃ মনিরুজ্জামান মনির সেপাই, ধানসাগর ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও ওষুধ কোম্পানির রিপ্রেজেন্টটিভ পরিচয় দানকারী সুমন সরদার ও উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারন সম্পাদক মোল্লা ইসহাক আলীর ছেলে আলীম আল রাজী মুক্তি কিছু উশৃংখল যুবক নিয়ে নিয়ে ঘটনাস্থলে মব সৃষ্টি করে সাংবাদিকদের হেনস্তা করার চেষ্টা করেন। অভিযোগ রয়েছে, তারা সংঘবদ্ধভাবে সাংবাদিকদের হেনস্তা করার চেষ্টা করে যা সংবাদকর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
এদিকে কলকাতা বারাসাত এলাকায় খবর নিয়ে জানা গেছে, ডাঃ মাহামুদুল হাসান যে ভারতীয় ডিগ্রি ব্যবহার করছেন খোদ কলকাতাতেই এমন কোন প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব নেই। এই ধরনের ভুয়া ডিগ্রি ব্যবহার করার দায়ে ইন্ডিয়াতেই গ্রেফতার করা হয়েছে বেশ কয়েকজনকে। তবে ইন্টিগ্রেটেড ফিজিশিয়ান সম্পর্কিত বাংলাদেশী আইনের বেশ কিছু ফাকফোকরকে তিনি ব্যবহার করেছেন আইনি অস্ত্র হিসাবে। আইনি ফাঁকফোকর আর স্থানীয় একটি চক্রের ছত্রছায়ায় থেকে চালিয়ে যাচ্ছেন এ ধরনের অবৈধ চিকিৎসা কার্যক্রম। সংবাদ প্রকাশ করতে গেলে রীতিমত মব সৃষ্টি ও মামলার ভয় দেখান তাই তার বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস পায় না কেউ। এর পরেও বিভিন্ন সময়ে ভুয়া এমবিবিএস ডাক্তারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন পত্রিকায় সসংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।
ভুক্তভোগী কয়েকজন রোগীসহ অভিযোগ করে বলেন, তার চিকিৎসা নিয়ে উপকার তো হয়নি, বরং আরও অসুস্থ হয়ে পড়েছি। আমরা সুষ্ঠু তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।
রোগী লামীয়া আক্তার বলেন, হাত ভেঙে যাওয়ার পর আমি ডা. মাহামুদুল হাসানের কাছে চিকিৎসা নিতে যাই। তিনি আমার হাতে ব্যান্ডেজ করে দেন। পরে হাতটি আরও বাঁকা হয়ে যায়। এরপর তিনি আমাকে একটি মলম দিয়ে বলেন, এটি ব্যবহার করলে হাত ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু বর্তমানে আমার হাত পুরোপুরি বাঁকা হয়ে গেছে। এখন মনে হচ্ছে, এ অবস্থার চিকিৎসা দেশে সম্ভব কি না তা নিয়েও শঙ্কায় আছি।
সাংবাদিক সৈকত মন্ডল বলেন, জনস্বাস্থ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে অনুসন্ধানী সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে আমরা নানা বাধার মুখে পড়েছি। একজন কথিত চিকিৎসকের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ থাকার পরও তিনি প্রকাশ্যে চিকিৎসা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন, যা সাধারণ মানুষের জন্য উদ্বেগের বিষয়। সংবাদ সংগ্রহকালে আমাদের কাজে বাধা দেয়া হয় এবং মব সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়। এ ঘটনায় আমি থানায় লিখিত অভিযোগ করেছি। আমি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছি।
বাগেরহাট প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি মো. কামরুজ্জামান বলেন, আমরা বক্তব্য নিতে গেলে তিনি কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান। পরে সেখান থেকে বের হওয়ার সময় কয়েকজন স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ও রিপ্রেজেন্টেটিভ আমাদের সঙ্গে অসংগত আচরণ করেন।
বাগেরহাট সুজনের সাধারণ সম্পাদক এস কে এ হাসিব বলেন, তিনি ভুয়া এমবিবিএস পরিচয়ে চিকিৎসা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিএমডিসির বৈধ নিবন্ধন আছে কি না, তা তদন্ত হওয়া জরুরি।
শরণখোলা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সামিনুল হক বলেন, সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্ত শেষে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
বাগেরহাট সিভিল সার্জন ডা. আ. স. ম. মো. মাহবুবুল আলম জানান, ডা. মাহামুদুল হাসানের বিষয়ে আমার দপ্তর থেকে ডিজি অফিসে আবেদন পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে নির্দেশনা পেলেই প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
তিনি আরও জানান, ইন্টিগ্রেটেড ফিজিশিয়ান পরিচয়ে কী ধরনের চিকিৎসাসেবা দেয়া যাবে সে বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে মতামত চাওয়া হয়েছে। নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত চেম্বার বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হলেও পরে আইনজীবীর নোটিশের পর তিনি পুনরায় রোগী দেখা শুরু করেন।
সাবেক সহকারী পরিচালক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (ডিজি হেলথ) এস এম লুতফর কবির বলেন, বিশ্বের যেকোনো দেশ থেকে চিকিৎসাশাস্ত্রে ডিগ্রি নিলেও বিএমডিসির অনুমোদন ও নির্ধারিত প্রশিক্ষণ ছাড়া বাংলাদেশে চিকিৎসাসেবা দেয়ার বৈধতা নেই।
অভিযোগের বিষয়ে ডা. মাহামুদুল হাসান বলেন, আমার বিএমডিসির কোনো অনুমোদন নেই। তবে তিনি ক্যামেরার সামনে কথা বলতে রাজি হননি আরও তার লোক দিয়ে সাংবাদিকদের সাথে মব সৃষ্টি করে।
আরও পড়ুন:








