শেরপুর জেলার সীমান্তবর্তী উপজেলাগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় চোরাচালান চক্র আরও সংগঠিতভাবে কার্যক্রম চালাচ্ছে বলে স্থানীয় সূত্র ও অনুসন্ধানে জানা গেছে। ভারতীয় সীমান্তসংলগ্ন দুর্গম পাহাড়ি ও বনাঞ্চল ব্যবহার করে মাদক, বিদেশি কসমেটিকসসহ বিভিন্ন অবৈধ পণ্য দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করানো হচ্ছে।
স্থানীয় এলাকা হিসেবে শ্রীবরদী উপজেলা, ঝিনাইগাতী উপজেলা ও নালিতাবাড়ী উপজেলা এলাকাকে চোরাচালানের গুরুত্বপূর্ণ রুট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব এলাকার ঘন বন, পাহাড়ি পথ এবং ঝিরিপথ চোরাকারবারিদের চলাচল সহজ করছে।
অনুসন্ধান অনুযায়ী, ভারতের মেঘালয় ও আসাম সীমান্তবর্তী তুরা ও ঢালু এলাকার বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে রাত ও ভোরের কুয়াশায় পণ্য বাংলাদেশে আনা হয়। পরে শেরপুর সীমান্তের অন্তত দুই ডজনের কাছাকাছি পয়েন্ট ব্যবহার করে এসব চালান দেশের ভেতরে প্রবেশ করানো হয়।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, বিলপাড়, নকশি, রাংটিয়া, লোহার ব্রিজ, গোমড়া, হালচাটি, তাওয়াকুচা, বালিজুড়ি, কর্ণজোড়া, বারোমারি, নাকুগাঁও ও পানিহাটা এলাকায় চোরাচালান কার্যক্রম বেশি সক্রিয়। এসব এলাকায় একাধিক সংগঠিত চক্র সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
তথ্য অনুযায়ী, কসমেটিকস চোরাচালানের সঙ্গে একটি গ্রুপ জড়িত রয়েছে, যাদের নেতৃত্বে কয়েকজন ব্যক্তি কাজ করছে। পাশাপাশি মাদক ও অন্যান্য অবৈধ পণ্যের নিয়ন্ত্রণে পৃথক কয়েকটি সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। এসব চক্রের অধীনে ছোট ছোট দল পণ্য পরিবহন ও বিতরণের কাজ করে।
চোরাচালানের প্রক্রিয়ায় প্রথমে সীমান্তের ওপারে নির্দিষ্ট স্থানে পণ্য জমা করা হয়। পরে ঝিরিপথ ব্যবহার করে বাংলাদেশে আনা হয় এবং বনাঞ্চলে সাময়িকভাবে সংরক্ষণ করা হয়। পরবর্তী ধাপে সেগুলো ইজিবাইক, মোটরসাইকেল ও সাধারণ ব্যাগের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়।
বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ময়মনসিংহ সেক্টরে অভিযান চালিয়ে প্রায় ৬০ কোটি ৫৮ লাখ টাকার অবৈধ পণ্য ও মাদক জব্দ করা হয়েছে। একই সময়ে ১১৪ জনকে আটক করা হয়। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিম্নস্তরের বহনকারীরাই ধরা পড়ছে, মূল চক্র এখনো পুরোপুরি শনাক্ত হয়নি।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সন্ধ্যার পর সীমান্ত এলাকায় চলাচল ও সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড বেড়ে যায়। তবে নিরাপত্তাজনিত কারণে অনেকেই প্রকাশ্যে কিছু বলতে চান না।
ঝিনাইগাতী উপজেলার এক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, রাত নামার পর এলাকায় অচেনা মানুষের চলাচল ও যানবাহনের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়, তবে আতঙ্কের কারণে কেউ প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে রাজি হন না।
নালিতাবাড়ী উপজেলার পানিহাটা এলাকার বাসিন্দারা জানান, এলাকার বেকার তরুণদের একটি অংশ দ্রুত আয়ের আশায় এসব কাজে যুক্ত হচ্ছে, তবে তারা মূল চক্রের নিয়ন্ত্রণে কাজ করে।
শেরপুর জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম বলেন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা আরও জোরদার করা এবং দুই দেশের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ কঠিন হবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, কার্যকর নজরদারি বাড়লে যুবসমাজকে এই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখা সম্ভব হবে।
শেরপুর জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান ভূঁঞা জানান, সীমান্তবর্তী বনাঞ্চল ও পাহাড়ি এলাকায় নজরদারির সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যা চোরাচালান রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। পুলিশ ও গোয়েন্দা ইউনিট নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে এবং বিভিন্ন সময়ে বড় পরিমাণ অবৈধ পণ্য জব্দ করা হচ্ছে।
অন্যদিকে ময়মনসিংহ ৩৯ বিজিবির সেক্টর কমান্ডার কর্নেল সরকার মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান জানান, সীমান্তে নিয়মিত টহল, গোয়েন্দা নজরদারি এবং প্রযুক্তিনির্ভর পর্যবেক্ষণ জোরদার করা হয়েছে। তিনি জানান, ড্রোন, নাইট ভিশন ডিভাইস ও ডিজিটাল সার্ভিলেন্স ব্যবস্থার মাধ্যমে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ চলছে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, সীমান্ত এলাকায় চোরাচালান রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আরও পড়ুন:








