রবিবার

১০ মে, ২০২৬ ২৭ বৈশাখ, ১৪৩৩

তিন দশক ধরে উপেক্ষিত হরিপুর তেল ক্ষেত্র, রহস্য রয়ে গেছে উত্তোলন বন্ধের কারণ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১০ মে, ২০২৬ ০৮:৫৪

শেয়ার

তিন দশক ধরে উপেক্ষিত হরিপুর তেল ক্ষেত্র, রহস্য রয়ে গেছে উত্তোলন বন্ধের কারণ
ছবি এআই মাধ্যমে বানানো

দেশের প্রথম স্বীকৃত তেল ক্ষেত্র হরিপুর তেল ক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছিল ১৯৮৬ সালে। পরের বছর থেকেই সেখানে বাণিজ্যিকভাবে তেল উত্তোলন শুরু করে পেট্রোবাংলা। প্রায় সাত বছরে ক্ষেত্রটি থেকে ৫ লাখ ৪২ হাজার ব্যারেল ক্রুড অয়েল উত্তোলনের পর ১৯৯৪ সালে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। তবে কেন এই তেল ক্ষেত্র পরিত্যক্ত হলো, তার সুনির্দিষ্ট কারণ নিয়ে আজও রয়েছে ধোঁয়াশা।

ভূতত্ত্ববিদ ও জ্বালানি খাতের সংশ্লিষ্টদের মতে, কূপে পানির প্রবাহ বৃদ্ধি, ওয়েলহেড প্রেসার কমে যাওয়া, কারিগরি সীমাবদ্ধতা এবং অব্যবস্থাপনাই উৎপাদন বন্ধের মূল কারণ হতে পারে। যদিও সরকারি ব্যাখ্যায় দীর্ঘদিন ধরে বলা হয়ে আসছে, ক্ষেত্রটি অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক ছিল না।

জ্বালানি খাতের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাপেক্স, পেট্রোবাংলা এবং বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন-এ দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করা মকবুল ই ইলাহী চৌধুরী বলেন, হরিপুর তেল ক্ষেত্র বন্ধের বিষয়ে যথাযথ কারিগরি প্রতিবেদন বা কূপ পরিত্যাগ সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ তার জানা মতে কখনো প্রকাশ করা হয়নি। তার ভাষায়, তেল ফুরিয়ে যাওয়া, পাইপলাইনে মোমজাতীয় পদার্থ জমে যাওয়া কিংবা অন্যান্য কারণের কথা বলা হলেও বিষয়টি নিয়ে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা অনুপস্থিত।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তেল উত্তোলনের প্রাথমিক পর্যায়ে প্রাকৃতিক চাপ কমে গেলে সাধারণত কৃত্রিম উত্তোলন প্রযুক্তি বা ‘আর্টিফিশিয়াল লিফটিং’ ব্যবহার করা হয়। এছাড়া সেকেন্ডারি রিকভারি পদ্ধতিতে পানি ইনজেকশনের মাধ্যমে ভূগর্ভে চাপ সৃষ্টি করে পুনরায় উৎপাদন বাড়ানোর ব্যবস্থাও বিশ্বজুড়ে প্রচলিত। কিন্তু হরিপুরে এসব আধুনিক পদ্ধতির কার্যকর প্রয়োগ হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

বিভিন্ন গবেষণা ও সরকারি তথ্য অনুযায়ী, হরিপুর তেল ক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে প্রায় এক কোটি ব্যারেল তেলের সম্ভাব্য মজুদ চিহ্নিত হয়েছিল। কিন্তু উত্তোলন করা হয়েছে মাত্র পাঁচ লাখ ব্যারেলের মতো। ফলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ক্ষেত্রটিতে এখনো বিপুল পরিমাণ তেল অবশিষ্ট থাকতে পারে।

ড. মো. আনোয়ার হোসেন ভূঁইয়া বলেন, কূপে পানি প্রবেশের কারণে উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেলেও পরবর্তী সময়ে নতুন কূপ খননের সুযোগ ছিল। তিনি মনে করেন, প্রতিটি অনুসন্ধান থেকেই কোনো না কোনো ফল পাওয়া যায় এবং হরিপুরে তেলের সম্ভাবনা পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছে, এমনটি বলার সুযোগ নেই।

একই ধরনের মত দিয়েছেন ড. মো. শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, বাংলাদেশের অনুসন্ধান কার্যক্রমে একটি স্তরে গ্যাস বা তেলের উপস্থিতি মিললেই অন্য সম্ভাবনাময় স্তরগুলো নিয়ে আর গভীর অনুসন্ধান করা হয় না। তার মতে, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণেও হরিপুরের মতো ক্ষেত্রগুলো যথাযথভাবে উন্নয়ন হয়নি।

এদিকে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে হরিপুর স্ট্রাকচার-এর সিলেট-১০ কূপে নতুন করে তেলের উপস্থিতির তথ্য দেয় পেট্রোবাংলা। তখন জানানো হয়েছিল, প্রায় ১ হাজার ৪০০ মিটার গভীরতায় তেলের স্তর পাওয়া গেছে এবং দৈনিক ৩৫ ব্যারেল তেল প্রবাহের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে প্রায় আড়াই বছর পার হলেও এখনো বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

বর্তমানে সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেড হরিপুর এলাকায় গ্যাস উত্তোলন অব্যাহত রেখেছে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. ফারুক হোসেন জানিয়েছেন, হরিপুর স্ট্রাকচারে নতুন করে সিলেট-১২ কূপ খননের পরিকল্পনা রয়েছে। সেখানে তেলের উপস্থিতি পাওয়া গেলে পুরনো হরিপুর তেল ক্ষেত্র পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

অন্যদিকে মো. শোয়েব বলেন, হরিপুরে একাধিকবার কূপ খননে মূলত গ্যাস পাওয়া গেছে এবং বর্তমানে সেখান থেকে গ্যাসই উত্তোলন করা হচ্ছে।

বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট এবং আমদানিনির্ভরতার ঝুঁকি বাড়তে থাকায় স্থানীয় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের বিষয়টি আবারো গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে প্রায় তিন দশক ধরে পরিত্যক্ত থাকা দেশের প্রথম তেল ক্ষেত্রকে পুনরুজ্জীবিত করতে এখনো দৃশ্যমান কোনো বড় উদ্যোগ নেয়নি পেট্রোবাংলা। বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত সার্ভে ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলে হরিপুর আবারও দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।



banner close
banner close