মৌসুম শুরুর আগেই বাজার ভরে গেছে কৃত্রিমভাবে পাকানো আম ও লিচুতে। অতি মুনাফার আশায় এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী অপরিপক্ব ফলে কার্বাইড, ইথোফেন ও বিভিন্ন রাসায়নিক ব্যবহার করে বাজারজাত করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বাইরে থেকে আকর্ষণীয় রঙের দেখালেও ভেতরে থাকছে কাঁচা ও স্বাদহীন ফল। এতে একদিকে প্রতারিত হচ্ছেন ক্রেতারা, অন্যদিকে বাড়ছে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি।
সম্প্রতি সাতক্ষীরায় অভিযান চালিয়ে প্রায় ৯ হাজার কেজি অপরিপক্ব আম জব্দ করেছে পুলিশ। গত ২৯ এপ্রিল রাতে সাতক্ষীরা সদর থানা পুলিশ গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে কালীগঞ্জ থেকে চট্টগ্রামগামী একটি ট্রাক আটক করে। ট্রাকটি থেকে ৩৫১ ক্যারেট আম জব্দ করা হয়, যার ওজন প্রায় ৯ হাজার কেজি। পুলিশের দাবি, এসব আম কেমিক্যাল ও কার্বাইড ব্যবহার করে পাকানো হয়েছিল।
এদিকে রাজধানীর বিভিন্ন খুচরা বাজার ও পাড়া-মহল্লায় প্রতিদিনই বিক্রি হচ্ছে আগাম আম ও লিচু। বাজারে গোবিন্দভোগ, গোলাপখাস, গুটি, কাটিমন ও বৃন্দাবনী জাতের আম বিক্রি হতে দেখা গেছে। জাত ও আকারভেদে খুচরা বাজারে প্রতি কেজি আম বিক্রি হচ্ছে ১৯০ থেকে ৩০০ টাকায়। অথচ পাইকারি আড়ৎ বাদামতলীতে একই আমের দাম কেজিপ্রতি ৬০ থেকে ১০০ টাকার মধ্যে। পাশাপাশি প্রতি ১০০টি লিচুর ছড়া বিক্রি হচ্ছে ৪৫০ থেকে ৯০০ টাকায়।
রাজধানীর নয়াপল্টনের বাসিন্দা মো. আমিনুল ইসলাম জানান, অফিস শেষে রাস্তার পাশের দোকান থেকে টকটকে হলুদ-লাল রঙের আম কিনেছিলেন সন্তানের জন্য। বাসায় নিয়ে কাটার পর দেখা যায়, বাইরে পাকা হলেও ভেতরে ছিল কাঁচা। এরপর রাতেই তার শিশুসন্তানের পেটব্যথা শুরু হয়। পুরো পরিবারকে ভোগান্তিতে পড়তে হয় বলে জানান তিনি।
নয়াবাজারে ফল কিনতে আসা মো. সালাউদ্দিন বলেন, “জেনেও কিনছি যে ভালো হওয়ার সম্ভাবনা কম। কিন্তু বছরের প্রথম ফল বলে লোভ সামলানো কঠিন। আম কিনলাম ২৫০ টাকা কেজিতে, আর লিচুর দাম চাইছে ৮০০ টাকা। অসাধু ব্যবসায়ীরা আগাম ফল এনে অতিরিক্ত মুনাফা করছে।”
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. শামীম আহমেদ বলেন, অপরিপক্ব ফল পাকাতে ক্যালসিয়াম কার্বাইড ও বিভিন্ন রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়, যা মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। কার্বাইড আর্দ্রতার সংস্পর্শে এসে অ্যাসিটিলিন গ্যাস তৈরি করে, যা পেটব্যথা, বমি, ডায়রিয়া, মাথা ঘোরা, স্মৃতিশক্তি হ্রাস ও স্নায়বিক সমস্যার কারণ হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এসব রাসায়নিক লিভার ও কিডনির ক্ষতি, এমনকি ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়াতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।
তিনি আরো জানান, অপরিপক্ব লিচুতে থাকা ‘মিথাইলিন সাইক্লোপ্রোপাইলগ্লাইসিন’ নামের উপাদান শিশুদের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। খালি পেটে এই ধরনের লিচু খেলে রক্তে গ্লুকোজ কমে গিয়ে মস্তিষ্কের জটিল রোগ এমনকি মৃত্যুও হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, ফল খাওয়ার আগে অন্তত এক থেকে দুই ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে রাখা এবং বেকিং সোডা বা হালকা গরম পানিতে ধুয়ে নেওয়া উচিত। এতে রাসায়নিকের প্রভাব কিছুটা কমানো সম্ভব।
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন বলেন, ফলের মৌসুমের আগেই অসাধু সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে ওঠে। তারা কাঁচা ফল কেমিক্যাল দিয়ে পাকিয়ে বাজারে ছাড়ে এবং বেশি দামে বিক্রি করে। অতীতে বিভিন্ন অভিযানে এমন প্রমাণও মিলেছে। তিনি বাজার তদারকি জোরদার এবং ভোক্তাদের সচেতন হওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ফলের বাজারে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। অনিয়ম পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
আরও পড়ুন:








