ঢাকার রাজপথ যেন ক্রমেই অনিরাপদ হয়ে উঠছে। ভোর কিংবা গভীর রাত, ব্যস্ত সড়ক বা অলিগলি, কোথাও মিলছে না স্বস্তি। রাজধানীতে ধারালো অস্ত্রের মুখে ছিনতাই, প্রকাশ্যে কুপিয়ে জখম, এমনকি গোলাগুলির ঘটনাও বেড়েছে উদ্বেগজনক হারে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযান ও বিপুলসংখ্যক গ্রেপ্তারের পরও পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি না হওয়ায় আতঙ্কে রয়েছেন সাধারণ মানুষ।
সম্প্রতি রাজধানীর আগারগাঁও এলাকায় ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা নগরবাসীর নিরাপত্তাহীনতাকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। ভোররাতে শাশুড়ির চিকিৎসার জন্য ২৫ হাজার টাকা নিয়ে নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে যাচ্ছিলেন শিল্পী বেগম (৪০)। নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ের সামনে পৌঁছালে দুটি মোটরসাইকেলে আসা ছয়জন সশস্ত্র যুবক তাঁর পথরোধ করে। টাকা ও মোবাইল ছিনিয়ে নিতে বাধা দিলে তাঁকে পেট ও পায়ে কুপিয়ে গুরুতর জখম করা হয়।
আহত শিল্পী বেগমকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তাঁর স্বামী আবদুল হক অভিযোগ করেন, ঘটনার পর শেরেবাংলানগর থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ নাম-পরিচয় ছাড়া মামলা নিতে অনীহা দেখায়। পরে শুধু একটি অভিযোগ গ্রহণ করা হয়।
এ বিষয়ে শেরেবাংলানগর থানার এসআই জাহিদ জানান, ঘটনাটি তদন্ত করা হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া যায়নি। অভিযুক্তদের শনাক্ত করা গেলে মামলা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
শুধু আগারগাঁও নয়, রাজধানীর মোহাম্মদপুর, মিরপুর, মালিবাগ, শাহবাগ, যাত্রাবাড়ী ও আদাবরসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রতিনিয়ত ঘটছে ছিনতাইয়ের ঘটনা।
গত ১ মে মালিবাগ রেলগেট এলাকায় তিন পোশাক শ্রমিককে চাকু দিয়ে কুপিয়ে আহত করে ছিনতাইকারীরা। শাহবাগ এলাকায় এক প্রবীণ দম্পতিকে কুপিয়ে টাকা ও মোবাইল ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। যাত্রাবাড়ীর কাজলায় যানজটে আটকে থাকা এক গাড়িচালককে ছুরিকাঘাতের ঘটনাও নগরবাসীকে শঙ্কিত করেছে।
এদিকে ছিনতাইয়ের পাশাপাশি বাড়ছে সন্ত্রাসীদের প্রকাশ্য গোলাগুলির ঘটনাও। গত ৭ মে মহাখালীর পুরনো কাঁচাবাজার এলাকায় মোটরসাইকেলে এসে এলোপাতাড়ি গুলি চালায় দুর্বৃত্তরা। এতে রফিকুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি গুরুতর আহত হন। একই দিনে কদমতলীর ঢাকা ম্যাচ কলোনিতে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই গ্রুপের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হন কয়েকজন।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় মাসে রাজধানী থেকে প্রায় এক হাজার ১০০ ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। শুধু ১ থেকে ৭ মে পর্যন্ত নানা অপরাধে গ্রেপ্তার হয়েছেন প্রায় ৭০০ জন, যার মধ্যে অন্তত ২০০ জন ছিনতাইকারী।
ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম) মো. ফারুক হোসেন বলেন, গ্রেপ্তারের পর অনেক ছিনতাইকারী দ্রুত জামিনে বেরিয়ে আবার একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। তাদের বড় অংশ মাদকাসক্ত বলেও জানান তিনি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে টহল ও চেকপোস্ট বাড়ানো হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
সম্প্রতি আদাবর এলাকায় কিশোর গ্যাং ‘রক্ত চোষা জনি গ্রুপ’-এর সদস্য ‘পাংখা রুবেল’ গ্রেপ্তারের ঘটনাও আলোচনায় এসেছে। পুলিশ জানিয়েছে, তার বিরুদ্ধে ছিনতাই, দস্যুতা, চাঁদাবাজি ও মাদকসংক্রান্ত মোট নয়টি মামলা রয়েছে। এর আগেও গ্রেপ্তার হলেও জামিনে বেরিয়ে আবার অপরাধে জড়ায় সে।
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্র বলছে, বর্তমানে রাজধানীতে তিন ধরনের ছিনতাইকারী সক্রিয়। পেশাদার সংঘবদ্ধ চক্র, মাদকাসক্ত কিশোর এবং কিশোর গ্যাং বা শৌখিন অপরাধী। এদের কেউ মোটরসাইকেলে, কেউ অটোরিকশা বা প্রাইভেট কার ব্যবহার করে ছিনতাই করছে।
ডিএমপির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম চার মাসে রাজধানীতে ১০১টি ছিনতাই ও দস্যুতার মামলা হয়েছে। তবে অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশি। কারণ ভুক্তভোগীদের অনেকে হয়রানির ভয়ে থানায় যান না, আবার কেউ মামলা না নিয়ে শুধু সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে ফিরে আসেন।
মানবাধিকারকর্মী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির বলেন, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো শুধু আইন-শৃঙ্খলার অবনতিই নয়, নাগরিক নিরাপত্তাবোধেরও সংকট নির্দেশ করছে। তাঁর মতে, বেকারত্ব, মাদকাসক্তি, অপরাধচক্রের বিস্তার ও দুর্বল নজরদারি এসব অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিয়মিত টহল, সিসিটিভি নজরদারি বৃদ্ধি, দ্রুত বিচার এবং কার্যকর কমিউনিটি পুলিশিং জরুরি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আরও পড়ুন:








