একটি অভিযোগই যথেষ্ট ছিল এক নিরপরাধ ইমামের জীবন তছনছ করে দিতে শান্ত এক গ্রাম, যেখানে ভোরের আজানের সুরে দিন শুরু হতো, সেখানেই নেমে আসে হঠাৎ অন্ধকার মুহূর্তে বদলে যায় সবকিছু মানবতা হয়ে পড়ে নীরব সত্য চাপা পড়ে মিথ্যার ভারে।
আমি নির্দোষ বারবার বলা সেই কণ্ঠ হারিয়ে যায় অবিশ্বাসের ভিড়ে কেউ শোনেনি, কেউ যাচাই করেনি। অপবাদ আর লাঞ্ছনার ভারে তাকে যেতে হয় কারাগারের অন্ধকারে।
কিন্তু সত্য থেমে থাকে না। সময়ের সাথে উন্মোচিত হয় এমন এক বাস্তবতা, যা শুধু চমকে দেয় না পুরো ঘটনাকে নতুনভাবে নাড়িয়ে দেয় ভিতর থেকে।
ঘটনাটি ফেনীর পরশুরাম উপজেলার বক্সমাহমুদ ইউনিয়নে এক কিশোরী ভুক্তভোগীকে ধর্ষণের মিথ্যা মামলা থেকে অবশেষে অব্যাহতি পেয়েছেন স্থানীয় মসজিদের ইমাম মোজাফফর আহমদ (২৫)।
ফরেনসিক ল্যাবে ডিএনএ পরীক্ষায় ওই কিশোরীর সদ্য ভূমিষ্ঠ সন্তানের সঙ্গে মোজাফফরের কোনো মিল পাওয়া যায়নি। উল্টো ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে বেরিয়ে এসেছে আসল অপরাধী, যিনি খোদ ভুক্তভোগীর নিজের বড় ভাই মোরশেদ (২২)। নিজের অপরাধ আড়াল করতে এবং ভাইকে বাঁচাতে ভুক্তভোগীর পরিবার সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মসজিদের নির্দোষ ইমামের ওপর এই অপবাদ চাপিয়েছিল। এই মিথ্যা অপবাদের জেরে মোজাফফরকে ১ মাস ২ দিন বিনাদোষে কারাবাস করতে হয়েছে, হারিয়েছেন সামাজিক মর্যাদা এবং চাকরি। শেষ পর্যন্ত মামলার খরচ চালাতে গিয়ে নিজের শেষ সম্বলটুকু বিক্রি করে তিনি এখন প্রায় নিঃস্ব।
তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সালে মক্তবের পাঠ শেষ করে ওই ভুক্তভোগী কিশোরী। মক্তব ছাড়ার পাঁচ বছর পর সে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে এবং পরবর্তীতে একটি কন্যাসন্তান প্রসব করে। এই ঘটনায় ২০২৪ সালের ২৪ নভেম্বর ভুক্তভোগীর পরিবার তার মক্তব শিক্ষক মোজাফফর আহমদের বিরুদ্ধে একটি ধর্ষণ মামলা দায়ের করে। সে সময় মোজাফফর বারবার নিজের নির্দোষিতার দাবি জানালেও কেউ তার কথা শোনেনি। উল্টো ২৬ নভেম্বর ফেনী কর্মরত প্রাঙ্গণ থেকে স্থানীয় মাতব্বর ও ভুক্তভোগীর মা তাকে জোরপূর্বক পুলিশের হাতে তুলে দেন। এরপর দীর্ঘ এক মাস দুই দিন কারাভোগের পর ২৮ ডিসেম্বর তিনি জামিনে মুক্ত হন। আইনি লড়াইয়ের খরচ জোগাতে ৫ শতক মূল্যবান জমিও বিক্রি করতে হয় তাকে। পাশাপাশি সামাজিকভাবেও চরম লাঞ্ছনার শিকার হন তিনি।
মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে ২০২৪ সালের ২২ ডিসেম্বর মোজাফফরের ডিএনএ পরীক্ষার জন্য নমুনা ঢাকায় সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হয়। প্রাথমিকভাবে ভ্যাজাইনাল সোয়াবে বীর্যের উপস্থিতি না পাওয়ায় ল্যাব থেকে ভুক্তভোগী ও তার সন্তানের সরাসরি ডিএনএ নমুনা চাওয়া হয়। এই সময় পুলিশ গভীরভাবে বিষয়টি তদন্ত করতে শুরু করে এবং ভুক্তভোগী কিশোরীকে জিজ্ঞাসাবাদ করে।
একপর্যায়ে ভুক্তভোগী স্বীকার করে যে, তার নিজের সহোদর ভাই মোরশেদ তাকে দীর্ঘদিন ধরে ধর্ষণ করে আসছিল। আসল ঘটনা ধামাচাপা দিতেই তার পরিবার ইমাম মোজাফফরকে এই মামলায় ফাঁসায়। এরপর ২০২৫ সালের ১৯ মে পুলিশ অভিযুক্ত বড় ভাই মোরশেদকে গ্রেপ্তার করে এবং পরদিন ২০ মে সে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।
পরবর্তীতে আইনি প্রক্রিয়া মেনে ভুক্তভোগী, তার সন্তান এবং বড় ভাই মোরশেদের ডিএনএ পরীক্ষার জন্য ঢাকার ফরেনসিক ল্যাবে নমুনা পাঠানো হয়।
গত বছরের ৯ আগস্ট প্রাপ্ত ডিএনএ রিপোর্টে নিশ্চিত করা হয় যে, নবজাতকের পিতৃপরিচয়ের সঙ্গে মোরশেদের ডিএনএ-র ৯৯.৯৯ শতাংশ মিল রয়েছে। ডিএনএ পরীক্ষার চূড়ান্ত সত্যতা পাওয়ার পর গত ১৭ এপ্রিল মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপ-পুলিশ পরিদর্শক (এসআই) শরীফ হোসেন আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। এতে নিরপরাধ মোজাফফর আহমদকে মামলার দায় থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয় এবং আপন বোনকে ধর্ষণের দায়ে মোরশেদকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দাখিল করা হয়। আসামি মোরশেদ বর্তমানে ফেনী জেলা কারাগারে বন্দি রয়েছে।
অব্যাহতি সংক্রান্ত আদালতের নথি হাতে পাওয়ার পর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ইমাম মোজাফফর আহমদ বলেন, "অবশেষে সত্যের জয় হয়েছে। তবে এই মিথ্যা অপবাদের কারণে আমি সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হয়েছি। মসজিদের ইমামতি ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের চাকরি হারিয়েছি, হারিয়েছি বসতভিটার জায়গা। আমি এই মানসিক হয়রানি, সামাজিক মর্যাদাহানি এবং অর্থনৈতিক ক্ষতির সুষ্ঠু ক্ষতিপূরণ চাই।"
তার আইনজীবী আবদুল আলিম মাকসুদ বিষয়টিকে একটি বিরল ঘটনা উল্লেখ করে বলেন, অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে একজন নির্দোষ মানুষকে ফাঁসানোর চেষ্টা করা হয়েছিল, যা ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে নস্যাৎ হয়েছে। স্থানীয় আলেম সমাজের প্রতিনিধি মুফতি আমিনুল ইসলামও এই ভুক্তভোগী ইমামের পুনর্বাসন ও আইনি সহায়তার জোর দাবি জানিয়েছেন।
পরশুরাম মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আশরাফুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, পুলিশ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে মামলাটি তদন্ত করেছে। ডিএনএ রিপোর্ট পাওয়ার পরপরই চার্জশিট থেকে মোজাফফরের নাম প্রত্যাহার করে মূল অপরাধীকে শনাক্ত করা হয়েছে। সমাজকে কলুষিত করার মতো এমন মিথ্যা অপবাদের ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি অবস্থান বজায় রাখবে পুলিশ।
আরও পড়ুন:








