শুক্রবার

৮ মে, ২০২৬ ২৫ বৈশাখ, ১৪৩৩

স্বাস্থ্য ব্যয়ে চাপে সাধারণ মানুষ, দরিদ্রদের আয়ের ৩৫ শতাংশ যাচ্ছে চিকিৎসায়

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৮ মে, ২০২৬ ০৭:৫৭

শেয়ার

স্বাস্থ্য ব্যয়ে চাপে সাধারণ মানুষ, দরিদ্রদের আয়ের ৩৫ শতাংশ যাচ্ছে চিকিৎসায়
ছবি সংগৃহীত

দেশে স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নের নানা দাবি থাকলেও চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ সাধারণ মানুষের জন্য ক্রমেই অসহনীয় হয়ে উঠছে। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৭৯ শতাংশই মানুষকে নিজ পকেট থেকে বহন করতে হচ্ছে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দরিদ্র পরিবারগুলো। গবেষণায় দেখা গেছে, দরিদ্র মানুষের আয়ের প্রায় ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত চিকিৎসা ব্যয়ে চলে যাচ্ছে, যেখানে ধনী পরিবারের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ৫ শতাংশ।

এই পরিস্থিতিতে অনেক পরিবার চিকিৎসা করাতে গিয়ে বিপর্যয়কর ব্যয়ের মুখে পড়ছে, আবার অনেকে প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও চিকিৎসাসেবা নিচ্ছে না।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) পরিচালিত এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। বৃহস্পতিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিআইডিএস সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত এক সেমিনারে ‘বাংলাদেশে অপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা চাহিদা ও ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ব্যয়ের পরিবর্তিত বাস্তবতা পুনর্বিবেচনা’ শীর্ষক গবেষণা উপস্থাপন করেন প্রতিষ্ঠানটির পপুলেশন স্টাডিজ ডিভিশনের প্রধান ও জ্যেষ্ঠ গবেষক ড. আবদুর রাজ্জাক সরকার। ২০২২ সালের খানা আয় ও ব্যয় জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষণাটি প্রস্তুত করা হয়েছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে প্রতি পাঁচজনের একজনের বেশি মানুষ গত এক মাসে স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজন অনুভব করেছেন। মোট জনগোষ্ঠীর ২২ দশমিক ৩২ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজনের কথা জানালেও এর মধ্যে প্রায় ১৫ শতাংশ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাননি। অর্থাৎ মোট চাহিদার প্রায় ৬৫ শতাংশ অপূর্ণ রয়ে গেছে।

গ্রামাঞ্চলে এই সংকট আরও প্রকট। গবেষণা অনুযায়ী, গ্রামে অপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবার হার ৬৫ শতাংশের বেশি, যেখানে শহরে তা প্রায় ৫৯ শতাংশ। জেলা পর্যায়ে নড়াইলে ৮১ শতাংশ এবং হবিগঞ্জে ৮০ শতাংশ মানুষ প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা পাননি। বিপরীতে ফেনীতে এই হার সবচেয়ে কম, ১৮ শতাংশ।

গবেষণায় চিকিৎসাসেবা না পাওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে উচ্চ ব্যয়, স্বাস্থ্য বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাব, ভয় এবং চিকিৎসাকেন্দ্রে যাওয়ার মতো সহায়তার অভাবের কথা উঠে এসেছে। অনেক মানুষ বাধ্য হয়ে ফার্মেসি বা অযোগ্য চিকিৎসকের শরণাপন্ন হচ্ছেন, যা গবেষণায় ‘অকার্যকর চিকিৎসা’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

বর্তমানে একটি পরিবারকে গড়ে প্রতি মাসে তিন হাজার ৪৫৪ টাকা স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করতে হচ্ছে, যা পরিবারের মোট ব্যয়ের প্রায় ১১ শতাংশ। গ্রামীণ পরিবারগুলোকে তাদের খাদ্যবহির্ভূত ব্যয়ের প্রায় ২৫ শতাংশ চিকিৎসায় ব্যয় করতে হচ্ছে।

স্বাস্থ্য ব্যয়ের বড় অংশই যাচ্ছে ওষুধ ও রোগ নির্ণয় পরীক্ষায়। বহির্বিভাগে চিকিৎসার জন্য গড়ে দুই হাজার ৩৪২ টাকা খরচ হচ্ছে। ডায়াগনস্টিক পরীক্ষায় গড়ে ব্যয় হচ্ছে দুই হাজার ৮১৪ টাকা এবং ওষুধে এক হাজার ২৮০ টাকা। হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিতে গেলে গড়ে খরচ হচ্ছে ৪২ হাজার ৪৮৩ টাকা।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, ক্যান্সার চিকিৎসায় কোনো কোনো পরিবারের ব্যয় ৮ লাখ ৪৮ হাজার টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছে। হৃদরোগে গড়ে প্রায় এক লাখ টাকা এবং কিডনি রোগে ৬৩ হাজার টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে।

গবেষকদের মতে, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অর্থায়ন ব্যবস্থা ক্রমেই ‘রিগ্রেসিভ’ বা দরিদ্রবিরোধী হয়ে উঠছে। কারণ ধনী পরিবারগুলো মোট টাকার হিসাবে বেশি খরচ করলেও দরিদ্রদের আয়ের তুলনায় চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ অনেক বেশি।

সেমিনারে সাবেক পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ব্যয় যত বাড়বে, বৈষম্যও তত বাড়বে। কারণ দরিদ্র মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকেও বঞ্চিত হয়। তিনি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, সরকার বৈষম্যহীন উন্নয়ন ও মানবিক কল্যাণ রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। স্বাস্থ্য খাতে বৈষম্য কমাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি কার্যকর ব্যয় নিশ্চিত করার ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে। তিনি জানান, সরকার এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা নিয়েছে এবং ২৫০ শয্যার হাসপাতালগুলোতে কার্ডিয়াক ইউনিট, কিডনি ডায়ালিসিস ও জটিল প্রসূতি সেবা চালুর বিষয় বিবেচনা করছে।

গবেষকরা বলছেন, কার্যকর জাতীয় বা সামাজিক স্বাস্থ্য বীমা ব্যবস্থা চালু না হলে দেশে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা কঠিন হবে। বর্তমানে চিকিৎসা ব্যয়ের যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা দরিদ্র ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য বড় সামাজিক সংকটে রূপ নিচ্ছে।



banner close
banner close