শুক্রবার

৮ মে, ২০২৬ ২৫ বৈশাখ, ১৪৩৩

তিন মাসে ১২৮ ধর্ষণ, বাড়ছে যৌন সহিংসতা ও বিচারহীনতার শঙ্কা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৮ মে, ২০২৬ ০৭:৪৮

শেয়ার

তিন মাসে ১২৮ ধর্ষণ, বাড়ছে যৌন সহিংসতা ও বিচারহীনতার শঙ্কা
ছবি এআই মাধ্যমে বানানো

দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ, গোপালগঞ্জ ও মানিকগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার একাধিক ঘটনায় জনমনে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে কয়েকজন অভিযুক্ত গ্রেপ্তার হলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল গ্রেপ্তার নয়, বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও সামাজিক অবক্ষয়ই পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করে তুলছে।

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর মধ্যে নেত্রকোনার মদনে ১১ বছর বয়সী এক মাদরাসাছাত্রীর অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার ঘটনায় অভিযুক্ত শিক্ষককে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব-১৪। অভিযোগ অনুযায়ী, শিশুটি স্থানীয় একটি কওমি মাদরাসায় পড়াশোনা করত এবং দীর্ঘদিন ধরে নির্যাতনের শিকার হয়। একইভাবে ময়মনসিংহের নান্দাইলে পথ হারানো এক নারীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় প্রধান আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীতেও দুই বছরের সন্তানের সামনে এক গৃহবধূকে ধর্ষণের অভিযোগে এক ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে।

অন্যদিকে মানিকগঞ্জে সাত বছরের শিশু আতিকাকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত কিশোরের পরিবারের সদস্যদের গণপিটুনিতে হত্যার ঘটনা দেশে ‘মব জাস্টিস’-এর প্রবণতা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা কমে যাওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে জনতা আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে।

পুলিশ সদর দপ্তর ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য বলছে, গত কয়েক বছরে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেনি। ২০২০ সালে নারী নির্যাতনের মামলা ছিল ২২ হাজার ৫১৭টি। ২০২১ সালে ২২ হাজার ১৩৬টি, ২০২৩ সালে ১৮ হাজার ৯৪১টি এবং ২০২৪ সালে ১৭ হাজার ৫৭১টি মামলা হয়। তবে ২০২৫ সালে তা আবার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১ হাজার ৮৯৯টিতে।

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর তথ্যমতে, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে দেশে ১২৮ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। জানুয়ারিতে ৩৫ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৩১ জন এবং মার্চে সর্বোচ্চ ৬১ জন ধর্ষণের শিকার হন। মার্চ মাসে ধর্ষণের শিকারদের মধ্যে ছয় বছরের নিচে পাঁচজন শিশু ছিল। সাত থেকে ১২ বছর বয়সী ১৪ জন শিশুও ধর্ষণের শিকার হয়েছে।

আসকের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে। কারণ বহু পরিবার সামাজিক চাপ, ভয়ভীতি কিংবা প্রভাবশালী আসামিদের হুমকির কারণে মামলা করে না। অনেক ক্ষেত্রে পুলিশও মামলা নিতে অনীহা দেখায় বলে অভিযোগ রয়েছে।

মানবাধিকার সংস্থা ম্যানাবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ)-এর তথ্য অনুযায়ী, মার্চ ও এপ্রিল মাসে দেশে ১০২টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ছিল ২৯টি এবং ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা পাঁচটি।

সাবেক আইজিপি নূর মোহাম্মদ বলেছেন, ধর্ষণের মামলা প্রমাণ করা অত্যন্ত কঠিন। সাক্ষীর অনুপস্থিতি, তদন্তে দুর্বলতা এবং দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেক সময় অপরাধীরা খালাস পেয়ে যায়। তিনি মাদরাসাগুলোর ওপর আরও কঠোর নজরদারির প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সময়ে ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার ঘটনায় কিশোর ও তরুণদের সম্পৃক্ততা বাড়ছে। কিশোর গ্যাং সংস্কৃতি, ইন্টারনেটের অপব্যবহার এবং পারিবারিক ও নৈতিক শিক্ষার অভাবকে এর পেছনের কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে সামাজিক প্রতিরোধ ও দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

বাংলাদেশ কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড (বেফাক)-এর মহাপরিচালক মাওলানা উবায়দুর রহমান খান নদভী বলেছেন, কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাঁকে আজীবনের জন্য চাকরিচ্যুত করা হয়। তবে তিনি দাবি করেন, কিছু ক্ষেত্রে শত্রুতার জেরেও অভিযোগ আনা হয়ে থাকে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করলেই পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে না। দ্রুত বিচার, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কঠোর মনিটরিং এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। অন্যথায় বিচারহীনতা, জনরোষ ও সামাজিক অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে।



banner close
banner close