আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলা জুড়ে খামারিদের মধ্যে চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি। উপজেলার ১৪টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় গরু-ছাগল মোটাতাজাকরণে ব্যস্ত সময় পার করছেন খামারিরা। আর কয়েক সপ্তাহ পরই জমে উঠবে কোরবানির পশুর হাট।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস সূত্রে জানা যায়, এ বছর কোরবানির জন্য বাঁশখালীতে পশুর চাহিদা রয়েছে ৫৬ হাজার ১১০টি। এর বিপরীতে সরবরাহ প্রস্তুত রয়েছে ৬০ হাজার ৩৮৯টি পশু। ফলে চাহিদার তুলনায় ৪ হাজার ২৭৯টি পশু উদ্বৃত্ত থাকবে। গত বছর এ উপজেলায় কোরবানির পশুর চাহিদা ছিল প্রায় ৪৬ হাজার, আর প্রস্তুত করা হয়েছিল প্রায় ৬২ হাজার পশু—যা চাহিদার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি ছিল। বাঁশখালীতে বর্তমানে ৩টি স্থায়ী ও ১২টি অস্থায়ীসহ মোট ১৫ থেকে ২০টি পশুর হাট বসবে বলে জানা গেছে। এসব হাটে উপজেলার বিভিন্ন খামারে লালিত পশু বিক্রি হবে।
প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্যমতে, এ বছর কোরবানির জন্য উপজেলায় গরু রয়েছে ৩৮ হাজার ৩৩২টি, মহিষ ৪ হাজার ৬৬২টি, ছাগল ১৪ হাজার ৭৮০টি এবং ভেড়া ২ হাজার ৬১৫টি। এতে করে স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে পার্শ্ববর্তী এলাকাতেও পশু সরবরাহ করা সম্ভব হবে।উপজেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে অর্ধশতাধিক গরু মোটাতাজাকরণ খামার এবং শতাধিক ছাগলের খামার রয়েছে। পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলের প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই বিক্রির উপযোগী ৮ থেকে ১০টি গরু ও ছাগল লালন করা হচ্ছে।
খামারিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কোরবানির পশুর কেনাবেচা সামনে রেখে তারা এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন পশুর পরিচর্যায়। অধিকাংশ খামারেই দেশি জাতের গরু ও ছাগল লালন করা হয়েছে। এসব পশুকে কাঁচা ঘাস, খৈল, ভুট্টা ও ধানের কুড়াসহ প্রাকৃতিক খাদ্য খাওয়ানো হচ্ছে। তবে পশুখাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে বলে জানান তারা।
উপজেলার খানখানাবাদ ইউনিয়নের খামারি মো. ইউসুফ বলেন, 'আমার খামারটি মূলত গরু মোটাতাজাকরণ খামার। এ বছর খামারে তিনটি গরু কোরবানির জন্য প্রস্তুত রয়েছে। পুরো এক বছরে তাদের পেছনে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ হাজার টাকা। তিনটি গরু বিক্রি করলে ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা লাভের আশা করছি। প্রতিবছর কোরবানির জন্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ১৫ থেকে ২০টি গরু কিনে এনে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করি। এ বছরও দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে গরু আনার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে আগের মতো তেমন লাভের আশা করছি না, বাজার কিছুটা মন্দা হতে পারে।'
সাধনপুর ইউনিয়নের বৈলগাঁও গ্রামের কৃষক মো. জসিম উদ্দিন বলেন, 'আমি প্রতিবছরই ঘরোয়া পদ্ধতিতে গবাদিপশু মোটাতাজাকরণ করি। গত বছর কোরবানির হাটে ১২টি গরু বিক্রি করেছি। এবার বিভিন্ন দামের ৯টি গরু বাজারে তোলার প্রস্তুতি নিয়েছি। ভবিষ্যতে বড় পরিসরে একটি খামার গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে আমার স্ত্রীও এই কাজে সহযোগিতা করছেন। বাজারদর অনুকূলে থাকলে ভালো লাভের আশা করছি।'
উপজেলা পৌরসভার কৃষক মো. ওসমান আলী মেম্বার বলেন, 'আমার একটি দুগ্ধ খামার রয়েছে। এর পাশাপাশি কোরবানির হাটকে সামনে রেখে গরু পালন করি। এ বছর আমার দুটি গরু বাজারে তোলার প্রস্তুতি রয়েছে। তবে বাণিজ্যিকভাবে বড় পরিসরে পালন করা হয়নি। বাজারে ভালো দাম পেলে ভবিষ্যতে এ খাতে আরও উৎসাহ নিয়ে কাজ করতে পারব।'
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও খামারিরা জানান, 'কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে আমরা দীর্ঘ সময় ধরে গরু লালন-পালন করেছি। তবে শেষ মুহূর্তে যদি বাজারে ভারতীয় গরু প্রবেশ করে, তাহলে আমরা মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ব এবং লোকসানের আশঙ্কা তৈরি হবে। তাই সরকারের কাছে আমাদের আকুল আবেদন—দেশীয় খামারিদের স্বার্থ রক্ষায় ভারতীয় গরুর অবৈধ প্রবেশ রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হোক। এ বছর পশুর ন্যায্য দাম নিশ্চিত হলে আগামীতে খামার আরও সম্প্রসারণ করা সম্ভব হবে।'
বাঁশখালী উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. সুপন নন্দী বলেন, 'এবার উপজেলায় কোরবানির পশুর চাহিদার তুলনায় চার হাজারেরও বেশি উদ্বৃত্ত রয়েছে। গত বছর এই উদ্বৃত্তের পরিমাণ আরও বেশি ছিল। বিগত ৪ থেকে ৫ বছর ধরে Lumpy skin disease (এলএসডি) এর প্রভাবে অনেক বাছুর আক্রান্ত হওয়ায় এবার গরুর সংখ্যা কিছুটা কম। পাশাপাশি গোখাদ্যের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় খামারিরা কিছুটা নিরুৎসাহিত হচ্ছেন, যার প্রভাব উৎপাদনের ওপর পড়েছে। আমাদের ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম নিয়মিতভাবে খামারিদের পরামর্শ ও সেবা দিয়ে যাচ্ছে। কোনো ধরনের রাসায়নিক উপাদান ছাড়া প্রাকৃতিক দানাদার খাদ্য ও কাঁচা ঘাস খাওয়ানোর বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। কোরবানির বাজারেও মেডিকেল টিম সক্রিয় থাকবে। আশা করছি, এ বছর খামারিরা ন্যায্য মূল্য পাবেন।'
আরও পড়ুন:

.jpg)






