বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন (বিএসসি)-এ দায়িত্ব পালনকালে সরকারি ক্রয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার, উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা এড়িয়ে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা প্রদান এবং কোটি কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় অর্থ বিধিবহির্ভূতভাবে ব্যয়ের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে সাবেক মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) ও বর্তমান চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সচিব মোহাম্মদ আশরাফুল আমিনের বিরুদ্ধে।
দেশের কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেলের (সিএজি) অধীন ‘মহাপরিচালকের কার্যালয়, পরিবহন নিরীক্ষা অধিদপ্তর’-এর একটি গোপন অডিট ২৪- নং মেমোতে উঠে এসেছে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য। অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিএসসির বিভিন্ন ক্রয় ও সেবা গ্রহণে সরকারি ক্রয় আইন উপেক্ষা করে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি (ওটিএম) এড়িয়ে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি (ডিপিএম) ব্যবহার করা হয়েছে, যার মাধ্যমে মোট ২ কোটি ৫৭ লাখ ৫ হাজার ৫৬৭ টাকা ব্যয় করা হয়।
সিএজি অডিট পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, এসব ক্রয়ের ক্ষেত্রে “রাষ্ট্রীয় জরুরি প্রয়োজন” বা “একক উৎস” সংক্রান্ত কোনো বৈধ ভিত্তি পাওয়া যায়নি। ফলে সরকারি ক্রয় আইন পিপিএ-২০০৬-এর ধারা ৬৮ এবং সরকারি ক্রয় বিধিমালা পিপিআর-২০০৮-এর বিধি ৭৪(১) ও ৭৬(১)(ক, খ, গ) সরাসরি লঙ্ঘিত হয়েছে।
সিএজি অডিটে যেসব অনিয়ম উঠে এসেছে
অডিট পরিশিষ্টে মোট ১১টি কাজ ও ক্রয় কার্যক্রমে অনিয়মের অভিযোগ উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
• বিএসসির ৪৬তম এজিএম উপলক্ষে স্টেশনারি ও ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট
• প্রধান কার্যালয়ের ডিজিটাল ম্যুরাল স্থাপন ও সংস্কার
• এসি ক্রয়
• আউটসোর্সিং সেবা গ্রহণ
• কৈবল্যধাম এলাকায় আনসার ক্যাম্প স্থাপন
সিএজি নিরীক্ষা কর্মকর্তাদের মতে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র আহ্বান না করে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে, যা সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
‘অমনিয়া লজিস্টিকস’-কে বিশেষ সুবিধার অভিযোগ
অডিট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিএসসির ৪৬তম এজিএম উপলক্ষে স্যুভেনির সামগ্রী ক্রয়ের জন্য প্রথমে উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করা হলেও পরে অন্যান্য দরদাতাকে বাদ দিয়ে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে ‘অমনিয়া লজিস্টিকস’-এর সঙ্গে চুক্তি সম্পাদন করা হয়।
শুধু তাই নয়, প্রায় ১ কোটি ১৩ লাখ টাকার চারটি আউটসোর্সিং কাজও একই প্রতিষ্ঠানকে দেয়া হয়েছে বলে অডিটে উল্লেখ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য, একই প্রতিষ্ঠানের প্রতি ধারাবাহিক আনুকূল্য সরকারি ক্রয় ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
দর নির্ধারণ ছাড়াই অর্থ পরিশোধের অভিযোগ
সিএজি অডিট রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, ‘আইডিয়াস’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে কোনো সুনির্দিষ্ট দর নির্ধারণ ছাড়াই প্রায় ২৪ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।
এছাড়া বঙ্গবন্ধুর ডিজিটাল ম্যুরাল স্থাপন ও সংস্কারকাজে প্রায় সাড়ে ৯ লাখ টাকা ব্যয় করা হলেও সেখানে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র আহ্বানের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। অডিট কর্মকর্তাদের মতে, বাজার যাচাই ও প্রতিযোগিতামূলক দর ছাড়া এ ধরনের ব্যয় সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনার নীতিমালার পরিপন্থী।
চট্টগ্রাম ড্রাইডক ও আনসার ক্যাম্প স্থাপন নিয়ে অডিট আপত্তি:
বিএসসির কৈবল্যধাম এলাকায় ১২ দশমিক ৭৭ একর জমিতে আনসার ক্যাম্প স্থাপনের প্রায় ৮০ লাখ টাকার কাজও সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে সম্পন্ন করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। অডিট কর্মকর্তারা বলছে, সাধারণ অবকাঠামোগত কাজেও ডিপিএম ব্যবহারের কোনো যৌক্তিকতা পাওয়া যায়নি।
দায়িত্ব ছিল স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা
বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের (বিএসসি) মতো একটি রাষ্ট্রীয় সংস্থায় মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) পদটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং স্পর্শকাতর। মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) হিসেবে মোহাম্মদ আশরাফুল আমিনের প্রধান দায়িত্বসমূহ ছিল:
• ক্রয় আইন অনুসরণ: সংস্থার সকল কেনাকাটা ও সেবা গ্রহণে পিপিএ-২০০৬ এবং পিপিআর-২০০৮ কঠোরভাবে মেনে চলা।
• উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা: স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবং সরকারি অর্থের অপচয় রোধে ওটিএম বা উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি নিশ্চিত করা।
• প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ: দাপ্তরিক শৃঙ্খলা রক্ষা, জনবল ব্যবস্থাপনা এবং সংস্থার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণ তদারকি করা।
• জবাবদিহিতা: বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং অডিট বা নিরীক্ষা সংক্রান্ত প্রশ্নের আইনানুগ জবাব দেয়া।
কিন্তু সিএজি অডিট প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা এড়িয়ে একাধিক ক্ষেত্রে একই প্রশাসনিক কাঠামোর অধীনে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে, যা রাষ্ট্রীয় কোষাগারের আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি বাড়িয়েছে।
সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে আইনি দায় ও দুদক আইনের প্রশ্ন
• আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিযোগগুলো প্রমাণিত হলে একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে আশরাফুল আমিনের কর্মকাণ্ড ‘দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪’ এবং ‘দণ্ডবিধি, ১৮৬০’-এর বিভিন্ন ধারার আওতায় অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
• ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ:
• অডিট প্রতিবেদনে উল্লিখিত তথ্য অনুযায়ী, সরকারি ক্রয়বিধি লঙ্ঘন করে নির্দিষ্ট ঠিকাদার বা প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেয়ার অভিযোগ উঠেছে, যা সরকারি কর্মচারীর ক্ষমতার অপব্যবহারসংক্রান্ত অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হতে পারে।
• রাষ্ট্রীয় আর্থিক ক্ষতির অভিযোগ:
অভিযোগ রয়েছে, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর) লঙ্ঘন করে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি (ডিপিএম)-এর মাধ্যমে কাজ প্রদান করায় সরকারের প্রায় ২ কোটি ৫৭ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে বিষয়টি দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
দুদকের অনুসন্ধান শুরু
বিএসসিতে দায়িত্ব পালনকালে ক্ষমতার অপব্যবহার ও কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ইতোমধ্যে অনুসন্ধান শুরু করেছে।
দুদকের উপ-পরিচালক সুবেল আহমেদের নেতৃত্বাধীন একটি টিম আশরাফুল আমিন, তাঁর স্ত্রী ও নির্ভরশীলদের নামে থাকা ফ্ল্যাট, গাড়ি, ব্যাংক হিসাবসহ বিভিন্ন সম্পদের তথ্য তলব করেছে। একই সঙ্গে আগামী ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে তাঁদের হাজির হওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
বর্তমান দায়িত্ব নিয়েও বিতর্ক
বর্তমানে মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তবে রাষ্ট্রীয় সিএজি অডিট প্রতিবেদনে উত্থাপিত এই অনিয়ম ও প্রশ্নবিদ্ধ ব্যয়ের অভিযোগ তাঁর বর্তমান প্রশাসনিক অবস্থান নিয়েও নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে। সুশাসন বিশ্লেষকদের মতে, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও দায় নির্ধারণ না হলে সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা কঠিন হয়ে পড়বে।
এদিকে, এসব অভিযোগ নিয়ে বারবার যোগাযোগ করলেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি আশরাফুল আমিনের।
আরও পড়ুন:








