শুক্রবার

৮ মে, ২০২৬ ২৫ বৈশাখ, ১৪৩৩

শরণখোলায় ভুয়া চিকিৎসকের দৌরাত্ম্য, সাংবাদিকদের ঘিরে ‘মব’

বাগেরহাট প্রতিনিধি:

প্রকাশিত: ৫ মে, ২০২৬ ১২:৪২

শেয়ার

শরণখোলায় ভুয়া চিকিৎসকের দৌরাত্ম্য, সাংবাদিকদের ঘিরে ‘মব’
ছবি সংগৃহীত

বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলায় এক কথিত এমবিবিএস চিকিৎসকের দৌরাত্ম্যকে ঘিরে উদ্বেগজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, প্রশাসনের নির্দেশনা উপেক্ষা করে মাহামুদুল হাসান নামের এক ব্যক্তি অবৈধভাবে অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছেন। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে সাংবাদিকদের ঘিরে ‘মব’ তৈরি করে চাপ প্রয়োগের ঘটনাও ঘটেছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রশাসনের পক্ষ থেকে পূর্বে অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসা বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হলেও তা অমান্য করে পুনরায় রোগী দেখা শুরু করেন তিনি। নিজেকে ‘ইন্টিগ্রেটেড ফিজিশিয়ান’ পরিচয়ে চিকিৎসা দিচ্ছেন, যার বৈধতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। এতে এলাকাবাসীর মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভ বাড়ছে।

গত সোমবার (৪ মে) বিকেলে সাংবাদিকরা তার বক্তব্য নিতে গেলে তিনি ক্যামেরার সামনে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান। পরে সাংবাদিকরা সেখান থেকে বের হওয়ার সময় স্থানীয় কিছু ব্যক্তি, যারা নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয়ধারী হিসেবে দাবি করেন, ঘটনাস্থলে জড়ো হয়ে ‘মব’ সৃষ্টি করেন। অভিযোগ রয়েছে, তারা সংঘবদ্ধভাবে সাংবাদিকদের হেনস্তার চেষ্টা করেন, যা সংবাদকর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি করেছে।

এদিকে বাগেরহাটের সিভিল সার্জন ডা. আ. স. ম. মো. মাহবুবুল আলম গত ১ মার্চ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের দপ্তরে লিখিতভাবে জানতে চান, ‘ইন্টিগ্রেটেড ফিজিশিয়ান’ পদবিধারী কোনো ব্যক্তি অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসা দিতে পারেন কি না—এ বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা দিতে। একই সঙ্গে তিনি মাহামুদুল হাসানকে গাইডলাইন না আসা পর্যন্ত চেম্বার বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন।

পরবর্তীতে ৫ মার্চ মাহামুদুল হাসান একজন আইনজীবীর মাধ্যমে সিভিল সার্জনের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগে নোটিশ পাঠান। নোটিশের প্রেক্ষিতে ১৯ এপ্রিল সিভিল সার্জন ব্যক্তিগত উদ্যোগে পাবলিক প্রসিকিউটরের মাধ্যমে জবাব দেন। ওই জবাবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গাইডলাইন না আসা পর্যন্ত তাকে ‘ইন্টিগ্রেটেড চিকিৎসক’ হিসেবে সেবা প্রদানের অনুমতি দেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। তবে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক লিখিত অনুমোদন দেওয়া হয়নি বলে পরে দাবি করেন সিভিল সার্জন।

অভিযোগ রয়েছে, ওই জবাব পাওয়ার পর থেকেই মাহামুদুল হাসান প্রকাশ্যে আবার অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসা দেওয়া শুরু করেন।

এর আগে গত ২২ ফেব্রুয়ারি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এক এনফোর্সমেন্ট অভিযানে তার ব্যবহৃত ডিগ্রির সত্যতা নিয়ে গুরুতর অসঙ্গতি ধরা পড়ে। স্থানীয়দের দাবি, তিনি যে এমবিবিএস ডিগ্রির কথা বলছেন, সেটি মূলত অল্টারনেটিভ মেডিসিনভিত্তিক, যার বাংলাদেশে কোনো স্বীকৃতি নেই। এমনকি ভারতে এ ধরনের ডিগ্রির গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

এ ছাড়া অতীতে হেলাল খান নামের এক ব্যক্তির দায়ের করা মামলায় ভুয়া চিকিৎসক হিসেবে দোষী সাব্যস্ত হয়ে তিনি ২১ দিনের কারাদণ্ড ভোগ করেছেন বলেও জানা গেছে।

সিভিল সার্জন ডা. মাহবুবুল আলম বলেন, “বিষয়টি পুরোপুরি অনুধাবন না করেই আইনজীবীর পরামর্শে নোটিশের জবাব দিয়েছিলাম। চেম্বার চালুর বিষয়ে আমার কাছ থেকে কোনো লিখিত অনুমতি নেওয়া হয়নি। ইতোমধ্যে একাধিক অভিযোগ পেয়েছি, তদন্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

দুদকের অনুসন্ধানে অসঙ্গতি, পূর্বের দণ্ড এবং প্রশাসনিক নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও কীভাবে অভিযুক্ত ব্যক্তি প্রকাশ্যে চিকিৎসা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন—এ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক দুর্বলতা নাকি সমন্বয়হীনতা—এই বিতর্ক এখন এলাকায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

সচেতন মহলের মতে, শরণখোলার এই ঘটনা কেবল একজন ভুয়া চিকিৎসকের বিষয় নয়; এটি প্রশাসনিক শৈথিল্য, সম্ভাব্য রাজনৈতিক ছত্রছায়া এবং জননিরাপত্তার জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।



banner close
banner close