চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ে আত্মহত্যা ও আত্মহত্যার প্রচেষ্টার ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। গত এক সপ্তাহে যশোর, ভোলা ও ঢাকায় তিনটি পৃথক ঘটনায় তিনজনের আত্মহত্যা—ঋণ, পরীক্ষার ফল ও ব্যক্তিগত-আর্থিক চাপের মতো ভিন্ন ভিন্ন কারণ সামনে এলেও মূলত বহুমুখী সংকটই মানুষকে এই চরম সিদ্ধান্তে ঠেলে দিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
যশোরের মনিরামপুরে সৌদি আরব থেকে ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসার পর ৩৫ বছর বয়সী ফিরোজ হোসেন আত্মহত্যা করেন। ভোলায় এসএসসির ইংরেজি পরীক্ষায় আশানুরূপ ফল না হওয়ায় ১৬ বছর বয়সী শিক্ষার্থী তৈয়বা জাহান চৈতি আত্মহননের পথ বেছে নেয়। অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী মুনিরা মাহজাবিন মিমো ব্যক্তিগত ও আর্থিক চাপের কথা উল্লেখ করে আত্মহত্যা করেন।
এদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা সামিউল ইসলাম আকাশ আত্মহত্যার চেষ্টা থেকে ফিরে এসে জীবনের গুরুত্ব নতুন করে উপলব্ধি করেছেন। পারিবারিক কলহ ও ব্যবসায়িক ক্ষতির চাপে বিষপান করলেও দ্রুত চিকিৎসার ফলে তিনি বেঁচে যান। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সেই অভিজ্ঞতা ছিল অত্যন্ত কষ্টকর এবং তাকে জীবন সম্পর্কে নতুন উপলব্ধি দিয়েছে।
জেলা হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৬৮৮ জন এবং ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত আরও ১৪৯ জন আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন। অর্থাৎ গত ১৬ মাসে মোট ৮৩৭ জন এ ধরনের চেষ্টায় লিপ্ত হয়েছেন। গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ৫২ জন মানুষ আত্মহত্যার চেষ্টা করছেন। জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ১০৮ জন এবং চলতি বছরের প্রথম চার মাসে ৩০ জন আত্মহত্যা করে মারা গেছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দাম্পত্য কলহ, আর্থিক সংকট, সম্পর্ক ভাঙন এবং সামাজিক চাপ মানুষের মানসিক স্থিতি নষ্ট করে দিচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিশেষায়িত মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি। চাঁপাইনবাবগঞ্জের সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় কোনো মনোরোগ বিশেষজ্ঞ না থাকায় অনেকেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাচ্ছেন না।
শাহ নেয়ামতুল্লাহ কলেজের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. শাহীন কাউসার বলেন, আত্মহত্যা প্রতিরোধে সচেতনতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত আত্মহত্যার আগে কয়েক মাস ধরে কিছু আচরণগত পরিবর্তন দেখা যায়, যা পরিবার ও সমাজের সদস্যরা বুঝতে পারলে অনেক ক্ষেত্রে এই ধরনের মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রোগ্রাম অফিসার ডা. আশরুফুজ্জান শাহিন জানান, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংকট থাকলেও উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসক ও নার্সদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রাথমিক মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও কাউন্সেলিং দেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজনে স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের মাধ্যমে রোগীদের বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠানো হচ্ছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. এ কে এম শাহাব উদ্দীন বলেন, ব্যক্তিগত সচেতনতা, পারিবারিক সহায়তা এবং সামাজিক উদ্যোগের সমন্বয়েই আত্মহত্যার প্রবণতা কমানো সম্ভব। মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া এবং সমস্যাগুলো ভাগ করে নেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারলে এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ তৈরি হবে।
আরও পড়ুন:








