সারাদেশে জ্বালানি তেলের সংকটে যখন দিশেহারা সাধারণ মানুষ। ঠিক সেই সময় উত্তরাঞ্চলের পার্বতীপুর ডিপো থেকে হাজার হাজার লিটার তেল যাচ্ছে অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে। পরে সেই তেল পৌঁছাচ্ছে না নির্ধারিত গন্তব্যে, বরং সরাসরি বিক্রি হচ্ছে কালোবাজারে কয়েকগুণ বেশি দামে।
২৭ এপ্রিল সকাল ১০টা। দিনাজপুরের পার্বতীপুর ডিপো থেকে মেঘনা পেট্রোলিয়াম অয়েল লিমিটেডে থেকে ৯ হাজার লিটার জ্বালানি তেল নেয় একটি তেলবাহী গাড়ী৷ চালান অনুযায়ী এর গন্তব্য ছিল ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার নেকমরদ বাজারে অবস্থিত ‘মেসার্স কাদের এন্টারপ্রাইজ’।
কিন্তু বাস্তব চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তেলবাহী গাড়িটিকে অনুসরণ করে দেখা যায়—নির্ধারিত গন্তব্যে না গিয়ে সেটি পৌঁছে যায় বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা শহরের থানা গেট সংলগ্ন এক ব্যবসায়ী আশরাফের দোকানে। সেখানেই পুরো তেল আনলোড করা হয়।
এ বিষয়ে গাড়িচালক নাসিরুল ইসলাম স্বীকার করেন, চালানে যেটি উল্লেখ থাকে বাস্তবে অনেক সময় তেল অন্যত্র সরবরাহ করা হয়।
অন্যদিকে, আশরাফের ছেলে মোহাম্মদ সুমন জানান, মেসার্স কাদের এন্টারপ্রাইজের তেল তারা তুলে বিক্রি করে থাকেন। মালিকানা এভিডেভিড করা হয়েছে। তারা নিয়মিতভাবে এভাবে তেল গ্রহণ করে থাকেন।
ঘটনার গভীরে গিয়ে অনুসন্ধানে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া যায়। যে ‘মেসার্স কাদের এন্টারপ্রাইজ’-এর নামে তেল উত্তোলন করা হয়েছে, সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়—প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৮ বছর আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে সেখানে কোনো কার্যক্রম নেই, এমনকি প্রতিষ্ঠানটির কোনো অস্তিত্বও খুঁজে পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলেও একই তথ্য পাওয়া গেছে। তারা জানান, বহু বছর ধরে ওই নামে কোনো ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে না।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, শুধু চলতি মাসেই এই ‘অস্তিত্বহীন’ প্রতিষ্ঠানের নামে প্রায় ১ লাখ ৮ হাজার লিটার জ্বালানি তেল উত্তোলন করা হয়েছে। পরে এসব তেল খোলা বাজারে কয়েকগুণ বেশি দামে বিক্রি করা হয়েছে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোকে টার্গেট করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট গোলাম ফেরদৌস বলেন, বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলাতেও। ‘মেসার্স টুম্পা ট্রেডার্স’ নামের আরেক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে, তেল নির্ধারিত গন্তব্যে না গিয়ে অন্যত্র সরবরাহ করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের সহকারী মহাব্যবস্থাপক (বিক্রয়) আহসানুল আমিন বলেন, নির্ধারিত স্থানের বাইরে তেল সরবরাহ বা বিক্রির কোনো সুযোগ নেই। এভিডেভিড করে মালিকানা হস্তান্তরের সুযোগ নেই৷ তবে জনবল সংকটের কারণে তদারকিতে কিছু ঘাটতি থাকতে পারে বলে তিনি স্বীকার করেন।
এদিকে, এমন অনিয়মের কারণে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ, আর লাভবান হচ্ছে একটি অসাধু চক্র।প্রশ্ন উঠছে—যারা তদারকির দায়িত্বে, তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে কীভাবে তেল কালোবাজারে যাচ্ছে? আর কবে থামবে এই অনিয়ম?
আরও পড়ুন:








