চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলায় দশকের পর দশক ধরে জমে থাকা বর্জ্যস্তুপে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। মনাকষা ইউনিয়ন ও রাণীহাটি বাজার এলাকায় এসব আবর্জনার স্তুপ দীর্ঘদিনেও অপসারণ হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
শিবগঞ্জ উপজেলার মনাকষা ইউনিয়ন পরিষদ ও বাজার সংলগ্ন এলাকায় প্রায় ৩০ বছর ধরে জমে আছে বর্জ্যের স্তূপ। বছরের পর বছর ধরে বাজারের সব ধরনের ময়লা, পচা খাবার, মৃত প্রাণীসহ নানা বর্জ্য এখানে ফেলা হচ্ছে। ফলে দুর্গন্ধে আশপাশের পরিবেশ অসহনীয় হয়ে উঠেছে। পথচারীদের চলাচল ব্যাহত হচ্ছে এবং বিভিন্ন রোগবালাই ছড়িয়ে পড়ছে। চলাচলে ভোগান্তির পাশাপাশি বাড়ছে রোগবালাই।
সবচেয়ে বেশি কষ্টে রয়েছে স্কুল-কলেজ ও মাদরাসার শিক্ষার্থীরা। স্থানীয় মনাকষা দাখিল মাদরাসার শিক্ষার্থী নাজিমুদ্দিন বাসেদ বলেন, “কোন উপায় না থাকায় এই পথ দিয়েই আমাদের মাদরাসা যেতে হয়। খুব দুর্গন্ধ, এতে আমরা প্রায়ই অসুস্থ হয়ে পড়ি।”
অথচ্ এ দূর্গন্ধযুক্ত ময়লা-আবর্জনার চারপাশেই রয়েছে মনাকষা ইউনিয়ন পরিষদ, ইউনিয়ন ভূমি অফিস, ক্লিনিক, কাজি অফিস সহ প্রায় সকল ধরনের সরকারী ও বেসরকারী সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান।
এদিকে বর্জ্য স্তুপের পাশেই রয়েছে দূর্গন্ধযুক্ত জলাবদ্ধতা। যেখানে যেখানে মশা, মাছির অবাধ বিচরণ। ফলে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে জীবাণু। এতে শ্বাসকষ্ট, চর্মরোগ, ডায়রিয়া এবং ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বাড়ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বাজারের সব ধরনের বর্জ্য, পচা খাবার, মৃত প্রাণীসহ নানা আবর্জনা এখানে ফেলা হয়। অভিযোগ করেও মেলেনি কোনো সমাধান। নির্দিষ্ট ডাম্পিং ব্যবস্থা না থাকায় ব্যক্তি মালিকানাধীন ও রাস্তার পাশের জমিতে ফেলা হচ্ছে এসব বর্জ্য। এতে পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি বাড়ছে মশার উপদ্রব।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ইসরাইল হক রেন্টু বলেন, “সব ময়লা এখানে ফেলা হয়। এতে বাচ্চারা অসুস্থ হয়ে পড়ছে। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। প্রায় ৩০বছর ধরেই এখানে ময়লা আবর্জনা ফেলা হয়।”
স্থানীয় ৭৫ বয়োসর্ধ্ব এক বৃদ্ধ নারী জানান, “রাস্তা দিয়্যা হাঁটা যায় ন্যা খো, গন্ধ কইরছে। মনে হইচ্ছে বুমি(বমি) উঠ্যা যাইবে।”
কালাম নামের স্থানীয় বাসিন্দা জানান, “গন্ধের কারণে থাকা যায় না। কোন প্রাণী মারা গেলে এখানেই ফেলে রেখে যায়। মশার উপদ্রবও বেড়ে গেছে। আমরা এর থেকে পরিত্রাণ চাই।”
একইভাবে শিবগঞ্জ উপজেলার রাণীহাটি বাজারের জেন্টু মিঞার মার্কেটের পেছনেও ১০ থেকে ১২ বছর ধরে পড়ে আছে ময়লা-আবর্জনা। দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে আশপাশের পরিবেশ।
তানিশা নামের ৫ম শ্রেণীতে পড়া রাণীহাটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী জানান, “এখানে অনেক ময়লা আর দুর্গন্ধ। আমাদের খুব কষ্ট হয়। আমরা চাই এগুলো সরানো হোক।”
তোরিকুল ইসলাম নামের স্থানীয় বাসিন্দা জানান, “এখানে প্রায় ১০-১২ বছর যাবৎ ময়লা ফেলা হচ্ছে। সরকারী কোন জায়গা না থাকার কারণে ব্যক্তি মালিকানাধীন জায়গায় এসব আবর্জনা ফেলা হচ্ছে। পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। চলাচলেরও সমস্যা হচ্ছে। দ্রুত অপসারণ করা প্রয়োজন।”
হোটেল ও দোকানদারেরা তাদের ময়লা আবর্জনাও এখানে যাচ্ছেতাই করে ফেলে রেখে যায়। নিষেধ করলেও শোনে না এমন অভিযোগ তুলে ধরেন দিলিপ কর্মকার নামের এক ব্যবসায়ী।
ময়লা স্তুপের পাশেই অবস্থিত লন্ড্রী দোকানদার হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, ‘এসব অপসারনের জন্য কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে না।’
যত্রতত্র খোলা জায়গায় দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকার ফলে পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে এবং রোগজীবাণু ছাড়াচ্ছে। এসব বর্জ্য অপসারণের বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-এর সহকারী পরিচালক আবু সাইদ-এর সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “বর্জ্য অপসারণের দায়িত্ব স্থানীয় সরকারের। এসব বর্জ্য অপসারণের বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের কোন দ্বায়িত্ব নেই।”
১০নং মনাকষা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মির্জা শাহাদাৎ হোসেন-এর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, “আগে একবার অপসারণ করা হয়েছিল। আবার উদ্যোগ নিচ্ছি, তবে সেগুলো অপসারণে জন্য যে গাড়ী প্রবেশ করবে সেই যানবাহন প্রবেশের রাস্তা না থাকায় অপসারণে দেরী হচ্ছে।”
দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা এসব ময়লা আবর্জনার স্তুপ সরানো ও স্থায়ী সমাধানের বিষয়ে শিবগঞ্জ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাজহারুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, “আমরা বিষয়টি সরেজমিনে পরিদর্শন করব এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।”
তিন দশকের অবহেলায় জমে থাকা এই বর্জ্যস্তুপ এখন শুধু দুর্গন্ধের উৎস নয়, বরং জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য এক নীরব হুমকিতে পরিণত হয়েছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা স্থানীয়দের। দীর্ঘদিনের এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পেতে দ্রুত বর্জ্য অপসারণ ও স্থায়ী সমাধান চান এখানকার বাসিন্দারা। পাশাপাশি বাজারের ব্যবসায়ীদের সচেতনতা বাড়ানোরও আহ্বান জানান তারা।
আরও পড়ুন:








