রবিবার

৩ মে, ২০২৬ ২০ বৈশাখ, ১৪৩৩

ঢাকায় কবরস্থানের সংকট: সংরক্ষণ ফি নাগালের বাইরে, বাড়ছে চাপ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৩ মে, ২০২৬ ১০:৪৬

শেয়ার

ঢাকায় কবরস্থানের সংকট: সংরক্ষণ ফি নাগালের বাইরে, বাড়ছে চাপ
ছবি সংগৃহীত

রাজধানী ঢাকায় কবরস্থানের তীব্র সংকট এবং উচ্চ সংরক্ষণ ফি সাধারণ মানুষের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঘনবসতির এই নগরে জমির স্বল্পতা ও পরিকল্পনার অভাবে প্রিয়জনের শেষ ঠিকানা নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।

যাত্রাবাড়ীর দিনমজুর আরমান হোসেন সম্প্রতি বাবাকে হারিয়ে পড়েন বিপাকে। গ্রামে ভিটেমাটি না থাকায় তিনি বাবাকে দাফন করেন জুরাইন কবরস্থানে। দাফন ও আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে তার ব্যয় হয় প্রায় ৫ হাজার টাকা। তার ভাষায়, গ্রামে কবর দিতে কোনো খরচ না লাগলেও ঢাকায় এ জন্য গুনতে হয় হাজার হাজার টাকা।

তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় সাধারণ কবরের জন্য ২ থেকে ৫ হাজার টাকা লাগলেও সংরক্ষণের খরচ অনেক বেশি। সর্বোচ্চ ২৫ বছরের জন্য কবর সংরক্ষণ করতে প্রায় দেড় কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে, যা মাসিক হিসাবে প্রায় ৫০ হাজার টাকার সমান। এছাড়া ৫, ৮, ১০ ও ১৫ বছরের জন্যও বিভিন্ন হারে উচ্চ ফি নির্ধারিত রয়েছে।

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, জমির তীব্র সংকট এবং পরিকল্পনার অভাবই এই পরিস্থিতির মূল কারণ। শোকের মুহূর্তে প্রিয়জনের কবর সংরক্ষণ করতে গিয়ে অধিকাংশ নগরবাসী আর্থিক চাপে পড়ছেন।

দুই সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার মোট আয়তন ৩০৫ দশমিক ৪৬ বর্গকিলোমিটার হলেও কবরস্থানের জন্য বরাদ্দ মাত্র ২৫১ একর, যা মোট এলাকার মাত্র ০.৩৩ শতাংশ। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ১৯২ একর এবং দক্ষিণে ৫৯ একর জমি রয়েছে। সংরক্ষিত কবরের জন্য নির্দিষ্ট অংশ বাদ দিলে সাধারণ মানুষের জন্য জায়গা আরও কমে যায়।

বিশেষ করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় সংকট বেশি প্রকট। এখানে আজিমপুর, খিলগাঁও ও জুরাইন—এই তিনটি প্রধান কবরস্থান রয়েছে। নতুন যুক্ত হওয়া ৩৬টি ওয়ার্ডে এখনো কোনো কবরস্থান নির্মিত হয়নি, যা সংকটকে আরও বাড়িয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী শহরে কবরস্থানের জন্য ০.৫ থেকে ১.৪ শতাংশ জমি বরাদ্দ রাখা উচিত। সেই তুলনায় ঢাকায় বরাদ্দ অনেক কম। এছাড়া প্রতিটি ওয়ার্ডে ছোট কবরস্থান গড়ে তোলার সুপারিশ থাকলেও বাস্তবায়ন হয়নি।

রাজউকের হিসাবে প্রতি ৫০ হাজার মানুষের জন্য অন্তত এক একর কবরস্থান প্রয়োজন। সে হিসাবে ঢাকার বর্তমান জনসংখ্যার জন্য ৪০০ থেকে ৫০০ একর কবরস্থান দরকার, যা বিদ্যমান ব্যবস্থার প্রায় দ্বিগুণ।

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, কবরস্থান শুধু একটি অবকাঠামো নয়, এটি মানুষের আবেগ ও স্মৃতির সঙ্গে জড়িত। কিন্তু পরিকল্পনার ঘাটতি ও উচ্চ ফি এই মানবিক বিষয়টিকেও অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে ফেলেছে। তারা মনে করেন, সংকট মোকাবেলায় নতুন কবরস্থান নির্মাণ, বিকল্প পরিকল্পনা এবং বাস্তবসম্মত ফি কাঠামো জরুরি।



banner close
banner close