সংসারের খরচ সামাল দিতে গিয়ে দেশের মধ্যবিত্ত এখন চরম চাপে। আয় স্থির থাকলেও নিত্যপণ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা ও যাতায়াতসহ প্রায় সব খাতেই ব্যয় বেড়েছে লাগামহীনভাবে। ফলে সঞ্চয় ভেঙে ও ঋণ করে চলতে বাধ্য হচ্ছেন নির্ধারিত আয়ের মানুষরা।
নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সরকারি সহায়তা থাকলেও মধ্যবিত্তরা অনেকটাই উপেক্ষিত। সামাজিক সংকোচে তারা সহায়তা চাইতেও পারেন না। এতে করে সীমিত আয়ের এই শ্রেণির আর্থিক চাপ দিন দিন তীব্র হচ্ছে। তারা বলছেন, অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হয়েও বাজেটে তাদের জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো সুরক্ষা নেই।
বিভিন্ন গবেষণা ও জরিপে দেখা গেছে, গত কয়েক বছরে দারিদ্র্য বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। একই সঙ্গে মধ্যবিত্তের সঞ্চয় কমেছে এবং ঋণনির্ভরতা বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় মাসে বিপুল পরিমাণ সঞ্চয়পত্র ভাঙা হয়েছে, যা অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার স্পষ্ট ইঙ্গিত। অনেক পরিবার এখন দৈনন্দিন খরচ মেটাতেই সঞ্চয়ের ওপর নির্ভর করছে।
আয়ের তুলনায় ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় শহরের পরিবারগুলোর আর্থিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, মাসিক গড় আয় কমলেও ব্যয় বেড়েছে, ফলে ঘাটতি পূরণে ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা—চাকরি হারানোর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে, যা মধ্যবিত্তের ভবিষ্যৎকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে।
জ্বালানি সংকটের প্রভাবে পরিবহন ব্যয় বাড়ায় বাজারে পণ্যের দাম আরও বেড়েছে। একই সঙ্গে বাসাভাড়া বৃদ্ধিও শহুরে জীবনে নতুন চাপ তৈরি করেছে। শিক্ষা খাতেও ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেক পরিবার সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে নিতে হিমশিম খাচ্ছে, ঝরে পড়ার হারও বাড়ছে।
সরকারি হিসাবে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও বাস্তবে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমেনি। বরং অনেক ক্ষেত্রে আয় বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম থাকায় প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, মধ্যবিত্তের ব্যবহৃত নিত্যপণ্যের দাম গড় মূল্যস্ফীতির তুলনায় বেশি বেড়েছে, যা তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে আসন্ন বাজেট ঘিরে মধ্যবিত্তের প্রত্যাশা বেড়েছে। করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো, নিত্যপণ্যে কর কমানো, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সহায়তা এবং টার্গেটেড নগদ সহায়তার মতো পদক্ষেপের দাবি উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এসব উদ্যোগ দান নয়, বরং মধ্যবিত্তের জন্য টেকসই সুরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলার অংশ হওয়া উচিত।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে মধ্যবিত্ত শ্রেণির সঞ্চয় ও সক্ষমতা আরও ক্ষয় হবে, যার প্রভাব পড়বে সামগ্রিক অর্থনীতির ওপরও। তাই বাজেটে এই বৃহৎ জনগোষ্ঠীর জন্য বাস্তবসম্মত ও দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
আরও পড়ুন:








