অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর একে একে জামিনে বেরিয়েছেন শীর্ষ সন্ত্রাসীরা। ২০২৪ সালের আগস্টেই তিনজন ও পরে আরও তিনজন ছাড়া পান। ছাড়া পেয়েই পুরোনো প্রভাব ফিরে পেতে মরিয়া হয়ে ওঠেন তারা।
এলাকাভিত্তিক প্রভাব বিস্তার করা এই শীর্ষ সন্ত্রাসীরা নতুন করে প্রভাব বিস্তার করতে গিয়ে ঝরাচ্ছেন রক্ত। গত দেড় বছরে অন্তত দুজন শীর্ষ সন্ত্রাসী আন্ডারওয়ার্ল্ডের দ্বন্দ্বে গুলিতে নিহত হয়েছেন। জোড়া খুনের পাশাপাশি চাঁদাবাজি, কুপিয়ে আহত করা, গুলি করে ভয় দেখানোর মতো বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছে।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, নির্ধারিত সময় পরপর আদালতে হাজিরা দেওয়ার শর্তে জামিন পেলেও শীর্ষ সন্ত্রাসীদের কেউ আর আদালতমুখো হননি। তাদের কেউ কেউ পালিয়ে গেছেন দেশের বাইরে, বাকি যারা দেশে আছেন তারাও আত্মগোপনে। আদালত থেকে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হলেও তারা থেকে গেছেন পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধরাছোঁয়ার বাইরে।
গণঅভ্যুত্থানের পর ছাড়া পাওয়া শীর্ষ সন্ত্রাসীরাই রক্ত ঝরাচ্ছে আন্ডারওয়ার্ল্ডে
পুলিশ পলাতক থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ধরতে না পারলে এক গ্রুপ আরেক গ্রুপের খবর রাখছে, একে অন্যকে টার্গেট করে হত্যা করছে। সবশেষ এ ধরনের টার্গেটের শিকার হন ২০০১ সালের তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নঈম আহমেদ টিটন। ২৮ এপ্রিল রাত ৮টার দিকে রাজধানীর নিউমার্কেট সংলগ্ন বটতলা এলাকায় গুলি করে হত্যা করা হয় তাকে।
গণঅভ্যুত্থানের পর ছাড়া পাওয়া শীর্ষ সন্ত্রাসীরাই রক্ত ঝরাচ্ছে আন্ডারওয়ার্ল্ডে
হাওরে বন্যার সম্ভাবনা, ২০ হাজার পরিবার পেল জাতিসংঘের আর্থিক সহায়তা
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ২০০৪ সালে ক্যান্টনমেন্ট এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হওয়ার পর টিটন কারাগারেই ছিলেন। দুই দশক পর ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট জামিনে বেরিয়ে আসেন। সেই বছরে আগস্টেই ছাড়া পান আরও দুই শীর্ষ সন্ত্রাসী।
তারা হলেন—ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলাল ও সানজিদুল ইসলাম ইমন ওরফে ক্যাম্পেন ইমন। কাছাকাছি সময়ে আরও ছাড়া পেয়েছেন শেখ মোহাম্মদ আসলাম ওরফে সুইডেন আসলাম, আব্বাস আলী, খোরশেদ আলম ওরফে রাসু।
টিটনকে হত্যার আগে ২০২৫ সালের ১০ নভেম্বর সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ঢাকার পুরান ঢাকার সূত্রাপুরে পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাইফ মামুনকে (৫৫) প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। তখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রগুলো জানিয়েছিল, অপরাধ জগতে পুনরায় সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা এবং পুরোনো বিরোধের জেরে তাকে হত্যা করা হয়।
মামুনকে এর আগেও একবার হত্যাচেষ্টা হয়। মামুন জামিনে বের হয়ে আসার পর ২০২৩ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর রাত ১০টার দিকে তেজগাঁও শিল্প এলাকার বিজি প্রেসের সামনের রাস্তায় শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাঈদ ওরফে মামুনের প্রাইভেট কার লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়ে একদল সন্ত্রাসী। এ সময় মোটরসাইকেলে করে ওই পথ দিয়ে নিজ বাসায় ফেরার সময় মাথায় গুলিবিদ্ধ হন ভুবন। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি।
মামুন হত্যার পেছনে আন্ডারওয়ার্ল্ডের দ্বন্দ্ব বলে জানা যায়। নাম আসে জামিনে থাকা সন্ত্রাসী ইমনের।
২০২৫ সালের ১০ জানুয়ারি নিউ এলিফ্যান্ট রোডে মাল্টিপ্ল্যান সেন্টারের সামনে দুই ব্যবসায়ীকে কোপানোর ঘটনাতেও নাম আসে ইমনের। তাকে করা হয় প্রধান আসামি। হামলার শিকার দুই ব্যবসায়ীর একজন ওয়াহেদুল হাসান দীপু। তিনি পিচ্চি হেলালের বড় ভাই। মার্কেট দখল নিয়ে ওই হামলার ঘটনা ঘটে।
এ ঘটনার পর ইমনের মা সংবাদ সম্মেলন করে দাবি করেন, তার ছেলে হামলার সঙ্গে জড়িত নয়।
একই বছরের ২০ সেপ্টেম্বর রায়েরবাজারে সাদেক খান আড়তের সামনে দুই যুবককে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় পিচ্চি হেলালের নাম আসে। ২২ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদপুর থানায় মামলা হয়। এতে আসামি করা হয় হেলালকে।
জামিনে বের হওয়ার পর টিটনও সক্রিয় হচ্ছিল বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। একাধিক চাঁদাবাজির অভিযোগ পাওয়া গেছে তার বিরুদ্ধে। একটি ঘটনায় মামলাও হয়েছে।
এবার টিটন হত্যার পরও দুজন শীর্ষ সন্ত্রাসীর নাম আসছে। টিটনের ভাইয়ের করা মামলায় সন্দেহভাজন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে পিচ্চি হেলালের নাম। হেলাল ছাড়াও তার কয়েকজন সহযোগীর নামও উল্লেখ করা হয়েছে। হাট ইজারা নিয়ে দ্বন্দ্ব ছিল বলে দাবি করেন তিনি।
টিটন হত্যায় হেলালের নাম আসার পর তিনি বিভিন্ন গণমাধ্যমে দাবি করেন, এ হত্যার সঙ্গে তিনি জড়িত নন, বরং টিটনের ভগ্নিপতি আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমনের ওপর দায় চাপান তিনি। গণমাধ্যমে দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি বলেন, টিটন নিজেই জীবিত অবস্থায় তাকে জানিয়েছিলেন, প্রতিপক্ষ ইমন (সানজিদুল ইসলাম ইমন ওরফে ক্যাপ্টেন ইমন) তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দিয়ে হয়রানি করছে এবং এমনকি তাকে হত্যার আশঙ্কার কথাও প্রকাশ করেছিলেন।
টিটন হত্যায় ইমনকে দায় দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও টিটনের পরিবার বলছে, সম্পর্ক খারাপ ছিল না। টিটনের মায়ের খোঁজখবর রাখতেন ইমন। তবে এ বিষয়ে ইমনের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ড বিষয়ে খোঁজ রাখা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সূত্রে জানা গেছে, নিহত টিটন, তার ভগ্নিপতি ইমন, পিচ্চি হেলাল সবাই নব্বইয়ের দশকে একসঙ্গে কাজ করতেন। তাদের নেতৃত্ব দিতেন সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদের ছোট ভাই তোফায়েল আহমেদ ওরফে জোসেফ। ক্ষমতার দ্বন্দ্বে আলাদা হয়ে যায় ইমন ও হেলাল। এদিকে জোসেফ গ্রেপ্তার হয় ১৯৯৭ সালে। এর দুই বছর পর ১৯৯৯ সালে হত্যার শিকার হন জোসেফের ভাই আবু সাঈদ টিপু ও তার বন্ধু এমরান। এতে আসামি করা হয় ইমন ও টিটনকে।
পরবর্তী সময়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট ক্ষমতায় আসার পর ২০০১ সালে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের একটি তালিকা করা হয়। ওই তালিকায় ইমন, টিটন, পিচ্চি হেলালদের নাম ছিল।
টিটন হত্যার তদন্তের সঙ্গে যুক্ত এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি ও এর আশপাশের এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্ব অনেক পুরোনো। শীর্ষ কয়েকজন সন্ত্রাসী কারাগার থেকে ছাড়া পাওয়ার পর দ্বন্দ্ব আরও চরম আকার ধারণ করেছে। একে অপরের লোকজনের ওপর নিয়মিতই হামলা করছে। খুনের মতো ঘটনাও ঘটছে।
টিটনও এই অপরাধজগতের দ্বন্দ্বের শিকার হতে পারে বলে ধারণা এই কর্মকর্তার। তিনি বলেন, পরিবারের অভিযোগ, আমাদের গোয়েন্দা তথ্য বলছে, প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে টিটনকে হত্যা করা হয়েছে।
জামিনে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসীদের যথাযথভাবে নজরদারিতে রাখা হয়নি উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, শীর্ষ সন্ত্রাসীরা জেলে থাকা অবস্থাতেও তাদের অপরাধ সাম্রাজ্য পরিচালনা করত। ৫ আগস্টের পরে ছাড়া পেয়ে তারা আরও শক্তিশালী হয়েছে। অনেকেই নতুন নতুন দল করেছে। এসব দল-উপদল আধিপত্যের লড়াইয়ে নেমেছে। কখনো চাঁদাবাজি, কখনো এলাকা নিয়ে তারা দ্বন্দ্বে জড়িয়ে খুনোখুনিতে লিপ্ত হচ্ছে। যদিও তারা জামিনে বের হওয়ার পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল তাদের ওপর নজরদারি করা হচ্ছে, কিন্তু সত্য কথা হলো কোনো নজরদারিই ছিল না। নজরদারি যে ছিল না সেটার প্রমাণ হলো সাম্প্রতিক এসব হত্যাকাণ্ড।
গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত টিটন হত্যায় কাউকে গ্রেপ্তারের খবর পাওয়া যায়নি। ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (গোয়েন্দা) মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, জড়িতদের গ্রেপ্তারে আমাদের একাধিক টিম কাজ করছে। টিটন হত্যায় এখনো কেউ গ্রেপ্তার হয়নি।
জামিনে বের হওয়া শীর্ষ সন্ত্রাসীরা আবার অপরাধে জড়ানো প্রসঙ্গে শফিকুল ইসলাম বলেন, জামিন আইনগত প্রক্রিয়া। এখন কেউ জামিনে বেরিয়ে পুনরায় অপরাধে জড়ালে তাকে অবশ্যই আইনের আওতায় আনা হবে। টিটন হত্যায় এমন কারও তথ্য পাওয়া গেলে তাকেও গ্রেপ্তার করা হবে। জামিনে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসীদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে আমরা পর্যবেক্ষণ করছি।
আরও পড়ুন:








