রবিবার

২৬ এপ্রিল, ২০২৬ ১৩ বৈশাখ, ১৪৩৩

পিরোজপুরে হাত-পা বিহীন নবজাতক: বাবার অস্বীকৃতি, মায়ের অটুট ভালোবাসা

পিরোজপুর প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ২৬ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:৩৬

শেয়ার

পিরোজপুরে হাত-পা বিহীন নবজাতক: বাবার অস্বীকৃতি, মায়ের অটুট ভালোবাসা
ছবি বাংলা এডিশন

পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলায় হাত-পা বিহীন এক নবজাতকের জন্মকে ঘিরে চাঞ্চল্যকর ও মানবিক এক ঘটনা সামনে এসেছে। জন্মের পর শিশুটিকে গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন বাবা, এমনকি ফেলে দিতে বলেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। তবে সব বাধা উপেক্ষা করে সন্তানকে বুকে নিয়েই বাড়ি ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মা লিজা আক্তার। এদিকে মানবিক বিবেচনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রসূতির সব চিকিৎসা ব্যয় মওকুফ করেছে।

জানা যায়, গত বুধবার (২২ এপ্রিল) রাত ৮টার দিকে উপজেলার মিয়ারহাট বন্দরের নিউ সততা প্রাইভেট হাসপাতালে সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে ছেলেশিশুটির জন্ম হয়। জন্মের পর দেখা যায়, শিশুটির দুই পা নেই এবং একটি হাত আংশিক বিকলাঙ্গ। এ অবস্থায় শিশুটির পিতা দিনমজুর আল আমীন তাকে গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান।

পরবর্তীতে বিষয়টি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নজরে এলে তারা মানবিক সহায়তার উদ্যোগ নেয়। প্রসূতি লিজা আক্তারের সিজারিয়ান অপারেশনসহ সব ধরনের চিকিৎসা ব্যয় মওকুফ করা হয়। একই সঙ্গে অপারেশন পরিচালনাকারী চিকিৎসক ডা. প্রীতিষ বিশ্বাস তাঁর সার্জন ফিও নেননি।

লিজা আক্তারের বাড়ি পাশ্ববর্তী নাজিরপুর উপজেলার কলারদোয়ানিয়া গ্রামে। হাসপাতালের বেডে বসে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি জানান, এটি তাঁর তৃতীয় সন্তান। জীবিকার তাগিদে তিনি ঢাকায় দিনমজুরের কাজ করেন। সন্তান গর্ভে থাকা অবস্থায় কয়েক দিন আগে বাড়িতে এসে ২২ এপ্রিল সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে সন্তানের জন্ম দেন।

তিনি বলেন, “আমার সন্তান অন্য শিশুদের মতো স্বাভাবিকভাবে জন্মায়নি। তার দুই পা ও একটি হাত নেই। এ কারণে আমার স্বামী তাকে ফেলে দিতে বলেছে। কিন্তু আমি আমার সন্তানকে কখনো ফেলে দিতে পারব না। স্বামী আমাকে না রাখলেও আমি আমার সন্তানকে ছাড়ব না। আমি তাকে মানুষ করে তুলব।”

ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে লিজা আরও বলেন, “আমি যত দিন বেঁচে আছি, কাজ করে সন্তানকে খাওয়াতে পারব। কিন্তু আমি মারা গেলে আমার সন্তানকে কে দেখবে—এই চিন্তাই আমাকে কষ্ট দিচ্ছে। কোনো হৃদয়বান ব্যক্তি সাহায্যের হাত বাড়ালে আমার সন্তানের ভবিষ্যৎ কিছুটা হলেও নিরাপদ হতে পারে।”

নিউ সততা প্রাইভেট হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোলাম মোস্তফা জানান, দিনমজুর এই নারী ও নবজাতকের অবস্থা বিবেচনায় চিকিৎসক দল মানবিক সহায়তা দিয়েছে। অপারেশন পরিচালনায় গাইনি বিশেষজ্ঞ ডা. প্রীতিষ বিশ্বাস, সহযোগী চিকিৎসক ডা. মোস্তফা কাউসার এবং অ্যানেস্থেসিয়া বিশেষজ্ঞ ডা. নাসরিন রহমান খানসহ পুরো টিম বিনামূল্যে সেবা প্রদান করেছেন। হাসপাতালের পক্ষ থেকেও সব খরচ মওকুফ করা হয়েছে।

অপারেশন পরিচালনাকারী চিকিৎসক ডা. প্রীতিষ বিশ্বাস বলেন, জিনগত কারণ বা গর্ভকালীন যথাযথ চিকিৎসার অভাবে এ ধরনের শিশু জন্ম নিতে পারে। অপারেশনটি ঝুঁকিপূর্ণ হলেও সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। শিশুটির শারীরিক অবস্থা তাদেরও মর্মাহত করেছে।

একদিকে বাবার নির্মম অস্বীকৃতি, অন্যদিকে মায়ের অটুট ভালোবাসা—এই নবজাতকের জন্ম সমাজের সামনে এক গভীর মানবিক প্রশ্ন তুলে ধরেছে। এখন সহানুভূতিশীল মানুষের সহযোগিতাই হতে পারে শিশুটির ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় ভরসা।



banner close
banner close