মঙ্গলবার

২১ এপ্রিল, ২০২৬ ৮ বৈশাখ, ১৪৩৩

জ্বালানি সংকটে ১৮ বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ, গ্রামে তীব্র লোডশেডিং

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২১ এপ্রিল, ২০২৬ ১৬:০৭

শেয়ার

জ্বালানি সংকটে ১৮ বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ, গ্রামে তীব্র লোডশেডিং
ছবি সংগৃহীত

জ্বালানি সংকটের কারণে দেশে ১৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে, যার প্রভাবে বিদ্যুৎ ঘাটতি বেড়ে লোডশেডিংয়ের চাপ বেশি পড়ছে গ্রামাঞ্চলে। বর্তমানে দৈনিক গড়ে প্রায় ১৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ১৪ হাজার মেগাওয়াট, ফলে এক হাজার মেগাওয়াটের বেশি ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।

চলতি বছরের শুরুতেই আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা, বিশেষ করে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের প্রভাবে আমদানিকৃত জ্বালানির সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। ফার্নেস তেল, কয়লা ও এলএনজির দাম বৃদ্ধি এবং আমদানি অনিশ্চয়তায় দেশের অধিকাংশ বিদ্যুৎকেন্দ্র জ্বালানি সংকটে পড়েছে। এতে ব্যয়বহুল তেলভিত্তিক উৎপাদন কমিয়ে গ্যাস ও কয়লাভিত্তিক উৎপাদনে জোর দিচ্ছে সরকার।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) সূত্রে জানা যায়, দেশে মোট ১৩৯টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা ২৯ হাজার ২৬৯ মেগাওয়াট হলেও বাস্তবে এর অর্ধেকেরও কম ব্যবহার হচ্ছে। গত ১৮ এপ্রিল পিক আওয়ারে চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৭২২ মেগাওয়াট, বিপরীতে উৎপাদন হয় ১৪ হাজার ৭৬৭ মেগাওয়াট। ২০ এপ্রিল সর্বোচ্চ চাহিদা ধরা হয়েছে ১৬ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট।

বিপিডিবির তথ্য অনুযায়ী, ১৬ এপ্রিল মোট ১,৪৮২ মেগাওয়াট লোডশেডিং করা হয়, যার মধ্যে ঢাকার বাইরে ছিল ১,১২২ মেগাওয়াট। অঞ্চলভিত্তিক হিসাবে খুলনা, রাজশাহী, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামে উল্লেখযোগ্য লোডশেডিং হয়েছে।

ন্যাশনাল লোড ডিসপ্যাচ সেন্টারের তথ্য বলছে, ১৮ এপ্রিল দিনভর বিভিন্ন সময়ে ২০০ থেকে ১,২০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং করা হয়েছে। ভোর ও গভীর রাতে ঘাটতির পরিমাণ তুলনামূলক বেশি ছিল।

জাতীয় গ্রিড ব্যবস্থাপনায় দেখা যায়, পূর্বাঞ্চল গ্রিডে ঢাকাকে অগ্রাধিকার দিয়ে বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। ১৮ এপ্রিল পূর্বাঞ্চলে ১০ হাজার ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের মধ্যে ঢাকাতেই দেওয়া হয়েছে ৫,৬১৮ মেগাওয়াট। বিপরীতে পশ্চিমাঞ্চল গ্রিডে মোট সরবরাহ ছিল মাত্র ৪,২৯৫ মেগাওয়াট।

মাঠপর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, গ্রামাঞ্চলে দিনে ৬ থেকে ৮ বার লোডশেডিং হচ্ছে, ফলে প্রতিদিন ৪ থেকে ৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। এতে কৃষি কাজ, সেচ কার্যক্রম এবং ক্ষুদ্র শিল্পে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। রংপুরের পীরগাছা উপজেলার এক বাসিন্দা জানান, “বিদ্যুৎ কখন আসে, কখন যায় বোঝা যায় না। দিনে ৭-৮ বার বিদ্যুৎ চলে গেলে স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হয়।”

অন্যদিকে শহরাঞ্চলে পরিস্থিতি তুলনামূলক সহনীয় থাকলেও রাতের দিকে লোডশেডিং বাড়ছে। সামনে এসএসসি পরীক্ষা থাকায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অভিভাবকরা।

বিদ্যুৎ খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, বর্তমানে দেশের ৮৮ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন তেল, গ্যাস ও কয়লানির্ভর। এর মধ্যে জ্বালানি সংকটে ১৮টি কেন্দ্র বন্ধ রয়েছে—যার মধ্যে ১০টি গ্যাসভিত্তিক এবং ৮টি তেলভিত্তিক। এছাড়া আরও ৩৫টি কেন্দ্র আংশিক উৎপাদন করছে।

বিপিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণে উৎপাদনে চাপ তৈরি হলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা চলছে। গ্যাস ও কয়লাভিত্তিক উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে ফার্নেস তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় তেলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে উৎপাদন সীমিত রাখা হচ্ছে।

এদিকে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট সময়ের পর বন্ধ রাখার সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়নে তদারকির ঘাটতি রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অনেক এলাকায় রাত ৯টার পরও দোকানপাট খোলা থাকায় বিদ্যুতের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।

সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে গ্রীষ্মের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লোডশেডিং আরও বাড়তে পারে, যার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে গ্রামাঞ্চলে।



banner close
banner close