সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক ব্যক্তি বা সরকার সংশ্লিষ্টদের নিয়ে মন্তব্য, ব্যঙ্গ কিংবা কটূক্তিকে কেন্দ্র করে মামলা ও গ্রেপ্তারের প্রবণতা এখনো পুরোপুরি থামেনি। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর কিছুটা পরিবর্তন এলেও সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখাচ্ছে, সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর বিভিন্ন ধারায় আগের মতোই মামলা ও গ্রেপ্তার হচ্ছে—যা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
সাম্প্রতিক এক ঘটনায় সরকারি দলের চিফ হুইপকে নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক কার্টুন শেয়ার করার অভিযোগে এ এম হাসান নাসিমকে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ। পরে তাকে আদালতে হাজির করা হলে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। এ ঘটনাকে ঘিরে জাতীয় সংসদেও আলোচনা ওঠে। অভিযোগ অনুযায়ী, একটি ফেসবুক পেজ থেকে চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনিকে নিয়ে সমালোচনামূলক পোস্ট শেয়ার করা হয়েছিল। এ ঘটনায় ১৮ এপ্রিল গুলশান থানায় দায়ের হওয়া মামলায় সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশের ২৫ ও ২৭ ধারায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
সংসদে এ বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন একাধিক সদস্য। তাদের অভিযোগ, রাজনৈতিক মতভিন্নতা দমন এবং বিরোধী মতকে চাপে রাখতে এসব মামলা ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি দাবি করেন, দীর্ঘদিন ধরে তাকে লক্ষ্য করে সংগঠিতভাবে সাইবার আক্রমণ চালানো হচ্ছিল এবং এর পক্ষে তিনি কিছু নথিও সংসদে উপস্থাপন করেন।
এর আগে বিভিন্ন জেলায় একই ধরনের অভিযোগে একাধিক গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে। মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে কটূক্তির অভিযোগে এক যুবককে গ্রেপ্তার করা হয় এবং পরে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দেওয়া হয়। ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় আপত্তিকর পোস্ট শেয়ারের অভিযোগে আরেক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। ভোলায় জ্বালানি সংকট নিয়ে পোস্ট দেওয়ার ঘটনায় এক নারী কর্মী গ্রেপ্তার হন, পরে আদালত তাকে জামিন দেন। ঠাকুরগাঁওয়েও রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ে কটূক্তির অভিযোগে আরেকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এদিকে ভুয়া তথ্য ও অপপ্রচার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি)-এর ফ্যাক্টচেকিং ইউনিট ‘বাংলাফ্যাক্ট’। তাদের দাবি, বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর প্রবণতা বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে পুরনো ভিডিও, বিকৃত ছবি বা ভিন্ন দেশের ঘটনা বাংলাদেশের নামে প্রচার করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর অপব্যবহারও বাড়ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হকের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে শিষ্টাচারের অভাব রয়েছে। তিনি বলেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা মানে এই নয় যে, কাউকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ, বিদ্বেষ বা অশালীন ভাষা ব্যবহার করা যাবে। এ ধরনের আচরণ সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, একদিকে ভুয়া তথ্য ও অপপ্রচার রোধ, অন্যদিকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আরও পড়ুন:








