রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভোজ্যতেলের বাজারে সরবরাহ সংকট ও মূল্য অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। বোতলজাত সয়াবিন তেল অনেক স্থানে পাওয়া যাচ্ছে না, আর যেখানে পাওয়া যাচ্ছে সেখানে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। এতে সাধারণ ভোক্তাদের ভোগান্তি বাড়ছে।
রোববার রাজধানীর সেগুনবাগিচা, কারওয়ান বাজার, তেজকুনিপাড়া ও মহাখালী কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ খুচরা দোকানে বোতলজাত সয়াবিন তেল নেই। কোথাও সীমিত পরিমাণে থাকলেও তা নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দরে বিক্রি করা হচ্ছে। পাঁচ লিটারের বোতল ৯৬০ থেকে ৯৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যেখানে সরকার নির্ধারিত মূল্য ৯৫৫ টাকা। এক থেকে দুই লিটারের বোতলেও অতিরিক্ত ১০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে।
খোলা সয়াবিন তেল লিটারপ্রতি ১৯৫ থেকে ১৯৮ টাকা এবং পামঅয়েল ১৮৪ থেকে ১৮৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ নির্ধারিত দাম যথাক্রমে ১৭৬ ও ১৬৬ টাকা। এতে প্রতি লিটারে ভোক্তাদের অতিরিক্ত ১৮ থেকে ২২ টাকা গুনতে হচ্ছে।
রাজধানীর সেগুনবাগিচা এলাকার এক ভুক্তভোগী ক্রেতা মাহমুদ আলী জানান, একাধিক দোকান ঘুরেও তিনি বোতলজাত সয়াবিন তেল পাননি। পরে বাধ্য হয়ে বেশি দামে খোলা তেল কিনতে হয়েছে। তেজকুনিপাড়ার বাসিন্দা মনিরা আক্তার বলেন, তিনি পাঁচ লিটারের একটি বোতল নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে কিনেছেন, কারণ অনেক দোকানে তেল পাওয়া যায়নি।
বাজার পরিস্থিতি নিয়ে খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা একে অপরের ওপর দায় চাপাচ্ছেন। কারওয়ান বাজারে তীর ব্র্যান্ডের ডিলার এ টি এন্টারপ্রাইজের প্রতিনিধি মো. সেলিম জানান, কোম্পানি আগের তুলনায় কম তেল সরবরাহ করছে এবং কমিশনও কমিয়েছে। ফলে বাজারে সংকট তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশ পাইকারি ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি গোলাম মাওলা বলেন, বোতলজাত তেলের সংকটের প্রভাব খোলা তেলের বাজারেও পড়েছে, যার কারণে দাম বেড়েছে।
অন্যদিকে তেল পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের দাম বৃদ্ধির কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। টি কে গ্রুপের পরিচালক শফিউল আতহার তাসলিম বলেন, গত দুই মাসে বিশ্ববাজারে তেলের দাম টনপ্রতি ১৫০ থেকে ২০০ ডলার পর্যন্ত বেড়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে কোম্পানিগুলো উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে তেল বিক্রি করছে এবং সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। তিনি আরও বলেন, মধ্যস্বত্বভোগীদের মজুত প্রবণতা বাজারে সংকটের একটি কারণ হতে পারে।
মেঘনা গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক মুজিবুর রহমান জানান, তাদের প্রতিষ্ঠান প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৪৫০ টন সয়াবিন তেল এবং প্রায় ৪০০ টন পামঅয়েল সরবরাহ করছে। তার মতে, সরবরাহ কমানো হয়নি, তবে বাজারের মধ্যবর্তী পর্যায়ে গরমিল থাকতে পারে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত ২ লাখ ৫৯ হাজার ৪৭৬ টন অপরিশোধিত সয়াবিন তেল এবং ৪ লাখ ২২ হাজার ১৭৭ টন অপরিশোধিত পামঅয়েল আমদানি হয়েছে। এতে বোঝা যায়, আমদানিতে উল্লেখযোগ্য ঘাটতি নেই।
ভোক্তা সংগঠনগুলোর মতে, বাজারে কার্যকর তদারকির অভাব রয়েছে। কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে তদারকি জোরদার না থাকায় ব্যবসায়ীরা সুযোগ নিচ্ছেন, যার প্রভাব পড়ছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত ভোক্তাদের ওপর।
এদিকে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পরিচালক আব্দুল জলিল জানান, আগের তুলনায় সরবরাহ বেড়েছে এবং বাজার নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে। তিনি বলেন, শিগগিরই শুল্ক কমানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত এলে বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারি দাবি ও বাজার বাস্তবতার মধ্যে অসামঞ্জস্য স্পষ্ট। কার্যকর নজরদারি ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় সমন্বয় না এলে ভোগান্তি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আরও পড়ুন:








