রবিবার

১৯ এপ্রিল, ২০২৬ ৬ বৈশাখ, ১৪৩৩

মানুষ ‘বেচে’ লাখোপতি: টেকনাফে ফের সক্রিয় পাচারচক্র

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৯ এপ্রিল, ২০২৬ ১৪:০৪

শেয়ার

মানুষ ‘বেচে’ লাখোপতি: টেকনাফে ফের সক্রিয় পাচারচক্র
ছবি সংগৃহীত

আন্দামান সাগরে মালয়েশিয়াগামী ট্রলারডুবির মর্মান্তিক ঘটনার পর টেকনাফের উপকূল ঘিরে মানব পাচার চক্রের তৎপরতা আবারও আলোচনায় এসেছে। স্থানীয় সূত্র ও অনুসন্ধানে জানা গেছে, শাহপরীর দ্বীপ, সাবরাং ও বাহারছড়া কেন্দ্র করে সংঘবদ্ধ দালালচক্র সক্রিয় রয়েছে, যারা দরিদ্র ও সহজ-সরল মানুষদের বিদেশে উচ্চ আয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সাগরপথে পাঠাচ্ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ‘টপটেন’ নামে পরিচিত অন্তত ১০ জন দালালের নেতৃত্বে দীর্ঘদিন ধরে এই পাচার কার্যক্রম চলছে। তাদের অধীনে শতাধিক মাঠকর্মী গ্রামে গ্রামে গিয়ে সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের চিহ্নিত করে দালালদের কাছে সরবরাহ করছে। বিনিময়ে তারা অর্থ পাচ্ছে। পাচারের শিকার অনেক পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, সাবরাং, শাহপরীর দ্বীপ ও বাহারছড়ার বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে পাচার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। স্থানীয়ভাবে যাদের নাম আলোচনায় এসেছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন আজম উল্লাহ, মোহাম্মদ সাদ্দাম, শাকের মাঝি ওরফে মোহাম্মদ শাকের, আবুল হাশিম ওরফে পোয়া মাঝি, মাহবুবুর রহমান ওরফে মাম্মা, আজগর আলী মাঝি, আবু তাহের, মোহাম্মদ ইসমাইল, সৈয়দ উল্লাহ, আব্দুল আলী, আজু প্রমুখ। এছাড়া আরও কয়েকজনের নাম স্থানীয়ভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে, যাদের বিরুদ্ধে মানব পাচারে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।

টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম বলেন, আলোচিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রাথমিক কিছু তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে এবং তদন্ত চলছে। জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।

এক দালাল পরিচয়ে কথা বলা সৈয়দ উল্লাহ দাবি করেন, ২০২৫ সাল পর্যন্ত তিনি এই কাজে যুক্ত ছিলেন, তবে থাইল্যান্ড সীমান্তে গণকবরের ঘটনা প্রকাশের পর আত্মগোপনে যান এবং বর্তমানে এসব কার্যক্রম থেকে সরে এসেছেন।

ভুক্তভোগীদের পরিবার জানায়, পাচারের কৌশল হিসেবে প্রথমে কাজ বা ঘোরার প্রলোভন দেখিয়ে তরুণ-তরুণীদের নিয়ে যাওয়া হয়। পরে বিদেশ থেকে ফোন করে মুক্তিপণ দাবি করা হয়। শাহপরীর দ্বীপের কোনাপাড়া এলাকার এক পরিবার অভিযোগ করে, তাদের দুই কিশোরীকে বাজারে নেওয়ার কথা বলে নিয়ে গিয়ে পাচার করা হয় এবং পরে থাইল্যান্ড থেকে ৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। অর্থের অভাবে তারা এখনও সন্তানদের ফেরাতে পারেনি।

এছাড়া সাবরাংয়ের এক স্কুলছাত্রকে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর কথা বলে নিয়ে গিয়ে ট্রলারডুবির ঘটনায় নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বহু পরিবার এখনও তাদের স্বজনদের ফেরার অপেক্ষায় রয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, গত এক দশকে এই পাচারচক্রের কারণে শতাধিক পরিবার তাদের উপার্জনক্ষম সদস্য হারিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু চিহ্নিত ব্যক্তির বিরুদ্ধে একাধিক মামলা থাকলেও তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে।

২০১৫ সালে মালয়েশিয়া-থাইল্যান্ড সীমান্তে বাংলাদেশিদের গণকবর আবিষ্কারের পরও একই রুটে পাচার কার্যক্রম বন্ধ হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা ও সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই চক্র দমন কঠিন।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস্) মো. অহিদুর রহমান বলেন, মানব পাচার প্রতিরোধে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে এবং জড়িতদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তবে এই অপরাধ দমনে সমাজের সব স্তরের মানুষের সম্মিলিত ভূমিকা প্রয়োজন।



banner close
banner close