দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার সরকারি দাবি থাকলেও মাঠপর্যায়ে সংকটের সুযোগ নিয়ে অনলাইনে প্রতারণা বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া পেজ খুলে অকটেন, পেট্রোল ও ডিজেল বিক্রির প্রলোভন দেখিয়ে অগ্রিম অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার একাধিক ঘটনা অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ফেসবুকে বিভিন্ন নামে পেজ খুলে চক্রগুলো স্বল্পমূল্যে জ্বালানি সরবরাহের বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। এসব পেজে দেশজুড়ে হোম ডেলিভারির আশ্বাস দিয়ে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করা হচ্ছে। পরে বুকিং বা ডেলিভারি চার্জের নামে ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত অগ্রিম নেওয়া হচ্ছে। অর্থ পাঠানোর পর অধিকাংশ ক্ষেত্রে গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে।
ভুক্তভোগী সাদমান জানান, ফেসবুকে বাংলাদেশ ফিলিং স্টেশন নামে একটি পেজে বিজ্ঞাপন দেখে তিনি ২০ লিটার অকটেনের জন্য ২০০ টাকা অগ্রিম পাঠান। এরপর সংশ্লিষ্ট নম্বর থেকে তাকে ব্লক করে দেওয়া হয়। একই পেজে অন্য নম্বর থেকে যোগাযোগ করলেও একইভাবে অগ্রিম অর্থ দাবি করা হয়।
খুলনা অঞ্চলেও একই ধরনের প্রতারণার অভিযোগ পাওয়া গেছে। সরেজমিন অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট পেজে দেওয়া ঠিকানায় কোনো ফিলিং স্টেশন বা বিক্রেতার অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। বাগেরহাটের এক মোটরসাইকেলচালক রোকনুজ্জামান বলেন, জরুরি প্রয়োজনে অনলাইনে তেল অর্ডার করে ২৫০ টাকা পাঠালেও পরে তাকে ব্লক করা হয়। তার সহকর্মীদের মধ্যেও একই ধরনের প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে বলে জানান তিনি।
ঢাকায় ফুয়েলএক্স নামে একটি পেজ থেকে জ্বালানি বিক্রির বিজ্ঞাপন দিয়ে ঢাকার মধ্যে ১৫ শতাংশ এবং বাইরে ২০ শতাংশ বুকিং চার্জ দাবি করা হচ্ছে। তবে দেওয়া নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করলে কোনো কার্যকর সাড়া পাওয়া যায়নি।
অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে, সততা পাইকারি স্টোর, অকটেন পেট্রোল গ্রুপ ঢাকা, পেট্রোল অকটেন ডিপোসহ একাধিক পেজ একই কৌশলে প্রতারণা চালাচ্ছে। এসব পেজে ভুয়া রিভিউ ও আকর্ষণীয় পোস্ট ব্যবহার করে গ্রাহকদের প্রলুব্ধ করা হচ্ছে এবং মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে অর্থ নেওয়ার পর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে।
এদিকে খোলাবাজারেও জ্বালানি তেল বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। ভুক্তভোগীরা জানান, কোথাও প্রতি লিটার তেলের দাম ২৫০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে।
পেট্রোল পাম্প মালিকরা বলছেন, তারা সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী তেল সরবরাহ করছেন। বাগেরহাটের খানজাহান আলী ফিলিং স্টেশনের স্বত্বাধিকারী মুরশিদ কুলি খান জানান, ডিপো থেকে প্রাপ্ত তেল নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় ট্যাগ অফিসারের উপস্থিতিতে সরবরাহ করা হচ্ছে। কেউ অতিরিক্ত তেল নিয়ে মজুদ করে বেশি দামে বিক্রি করলে তা নিয়ন্ত্রণ করা পাম্পের পক্ষে সম্ভব নয়।
ওই পাম্পের ট্যাগ অফিসার মো. ফারুক আহমেদ বলেন, প্রতিদিন ডিপো থেকে সরবরাহ পাওয়া তেল যানবাহনের চাহিদা অনুযায়ী বিতরণ করা হচ্ছে এবং কৃত্রিম সংকট এড়াতে নজরদারি বজায় রাখা হয়েছে।
প্রশাসন জানিয়েছে, জ্বালানি তেল মজুদ ও কালোবাজারি ঠেকাতে মাঠপর্যায়ে তদারকি জোরদার করা হয়েছে। বাগেরহাটে সম্প্রতি এক অভিযানে একটি অয়েল ইনস্টলেশনে নির্ধারিত হিসাবের বাইরে ১২ হাজার ৬১৩ লিটার তেল পাওয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে এবং ট্যাংক সিলগালা করা হয়েছে।
বাগেরহাটের পুলিশ সুপার মোহাম্মাদ হাছান চৌধুরী বলেন, তেল মজুদ ও প্রতারণা ঠেকাতে নিয়মিত নজরদারি চলছে এবং সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন জানান, সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী বিশেষ মনিটরিং টিম কাজ করছে এবং বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করে মজুদদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অনলাইনে জ্বালানি কেনাবেচায় প্রতারণার ঝুঁকি থাকায় সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের সহকারী পুলিশ কমিশনার এন এম নাসিরুদ্দিন বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জ্বালানি বিক্রির অধিকাংশ পোস্ট ভুয়া। যাচাই ছাড়া কোনো লেনদেন না করা এবং অগ্রিম অর্থ প্রদান থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেন তিনি। প্রতারণার শিকার হলে দ্রুত নিকটস্থ থানায় অভিযোগ বা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে যোগাযোগ করার আহ্বান জানান তিনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সংকটকালীন পরিস্থিতিতে অনলাইন প্রতারণা বাড়ে। তাই যাচাই-বাছাই ছাড়া অর্থ লেনদেন না করা এবং অনুমোদিত উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করা নিরাপদ।
আরও পড়ুন:








