বৃহস্পতিবার

১৬ এপ্রিল, ২০২৬ ৩ বৈশাখ, ১৪৩৩

মাতারবাড়ী প্রকল্পে বালু সরবরাহে অনিয়মের অভিযোগ, রাজস্ব ক্ষতির আশঙ্কা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৬ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:৪৪

শেয়ার

মাতারবাড়ী প্রকল্পে বালু সরবরাহে অনিয়মের অভিযোগ, রাজস্ব ক্ষতির আশঙ্কা
ছবি সংগৃহীত

মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর সংযোগ সড়ক নির্মাণ প্রকল্পে বালু সরবরাহকে ঘিরে অনিয়ম ও রাজস্ব ক্ষতির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, বালু বিক্রির মাধ্যমে লাভবান হবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান, অথচ উত্তোলনের ব্যয় বহন করবে সরকার, ফলে শত শত কোটি টাকার রাজস্ব হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

কক্সবাজার, ১৬ এপ্রিল: মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের সংযোগ সড়ক নির্মাণে ১২ হাজার ৯৪২ কোটি টাকা ব্যয়ে ২৭ দশমিক ২ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ করছে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর। এতে প্রতি কিলোমিটার নির্মাণ ব্যয় দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৪৭৬ কোটি টাকা। প্রকল্পটির বালু সরবরাহ প্রক্রিয়া নিয়ে জেলা প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কোনো উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়াই টোকিও-এমআইএল-জেভি নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে সমুদ্র থেকে বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। প্রতি ঘনফুট বালুর মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ টাকা ৯৪ পয়সা। একই সঙ্গে ড্রেজিং ব্যয় বাবদ প্রতি ঘনফুটে ৪ টাকা ৫৬ পয়সা সরকারি কোষাগার থেকে বহনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। ফলে বালু বিক্রি করে লাভ করবে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান, আর উত্তোলন ব্যয় বহন করবে সরকার।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, প্রকল্প সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রমে ১০০ থেকে ১৪০ কোটি ঘনফুট বালুর প্রয়োজন। নির্ধারিত মূল্যে এ পরিমাণ বালু থেকে সরকারের প্রায় ৬৯৪ কোটি টাকা রাজস্ব পাওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও বর্তমান ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য অংশের অর্থ ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের কাছে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এদিকে, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর প্রতি ঘনফুট বালুর মূল্য ১৬ টাকা ৭০ পয়সা প্রস্তাব করেছিল। গণপূর্ত বিভাগও প্রায় একই হার নির্ধারণ করে। তবে শেষ পর্যন্ত ২০২৩ সালের হার অনুযায়ী ৬ টাকা ৯৪ পয়সা নির্ধারণ করা হয়।

জেলা প্রশাসনের একটি চিঠি অনুযায়ী, প্রাথমিকভাবে ৬ কোটি ৩৪ লাখ ৫৯ হাজার ১৮২ ঘনফুট বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। একই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ড্রেজিং ব্যয় সরকার বহন করবে। এতে কমপক্ষে ৪৫০ কোটির বেশি অর্থ সরকারি কোষাগার থেকে ব্যয় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের কক্সবাজার কার্যালয়ের পরিচালক মো. জমির উদ্দিন বলেন, পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন ছাড়া বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়ার সুযোগ নেই। এ বিষয়ে কোনো আবেদনও পাওয়া যায়নি। অনুমোদন ছাড়া বালু উত্তোলন হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের কক্সবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী রোকন উদ্দিন খালেদ চৌধুরী জানান, তাদের কাছে কেবল বালুর রয়্যালটি নির্ধারণে মতামত চাওয়া হয়েছিল এবং তারা তা লিখিতভাবে দিয়েছেন। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জেলা প্রশাসনের এখতিয়ারভুক্ত।

অভিযোগের বিষয়ে কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী গঠিত কমিটির সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও জানান, প্রকল্পের বিস্তারিত তথ্য চেয়ে সংশ্লিষ্ট প্রকল্প পরিচালকের কাছে চিঠি দেওয়া হলেও এখনো কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ বলেছে, তথ্যগুলো সঠিক হলে এটি ক্ষমতার অপব্যবহার এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয়ের শামিল। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, উচ্চমূল্যের সম্পদ কম দামে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ঘাটতি রয়েছে। এ অবস্থায় যথাযথ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ না হলে সরকারের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি হতে পারে।



banner close
banner close