রবিবার

১২ এপ্রিল, ২০২৬ ২৯ চৈত্র, ১৪৩২

আস্তানায় কথিত পীরকে হত্যা: থমথমে পরিস্থিতি, আটক-মামলা হয়নি এখনো

কুষ্টিয়া প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১২ এপ্রিল, ২০২৬ ১৩:৪০

শেয়ার

আস্তানায় কথিত পীরকে হত্যা: থমথমে পরিস্থিতি, আটক-মামলা হয়নি এখনো
ছবি বাংলা এডিশন

কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে এক ‘পীরের’ আস্তানায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় তাকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যার পর পুরো এলাকা থমথমে হয়ে রয়েছে। শনিবার (১১ এপ্রিল) দুপুরে উপজেলার ফিলিপনগর ইউনিয়নের দারোগার মোড় এলাকায় ‘শামিম বাবার দরবার শরিফ’ নামে পরিচিত স্থাপনাটিতে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় এখনো মামলা হয়ন, কাউকে আটক করতে পারেনি পুলিশ।

ঘটনার পর থেকে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পুলিশ, বিজিবি, সেনাবাহিনী ও র‍্যাব সদস্যরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। পাশাপাশি উপজেলা প্রশাসন, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, স্থানীয় সংসদ সদস্য ও খুলনা রেঞ্জ পুলিশের এডিশনাল ডিআইজি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।

নিহত আব্দুর রহমান ওরফে শামিম (৬৫) ওই দরবারের প্রধান ছিলেন। হামলায় আরও তিন অনুসারী মহন আলী, জামিরুন নেছা ও জুবায়েরআহত হন; তারা স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন।

ঘটনার পর রোববার সকাল পর্যন্ত কাউকে আটক করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। নিহতের মরদেহ কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। রোববার সকাল সাড়ে ৮টা পর্যন্ত ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়নি বলে জানিয়েছে পরিবার। ময়নাতদন্ত শেষে দরবার সংলগ্ন পারিবারিক কবরস্থানে দাফনের কথা রয়েছে। পরে পরিবারের পক্ষ থেকে আইনি পদক্ষেপের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন নিহতের বড় ভাই ফজলুর রহমান।

এবিষয়ে দৌলতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমান বলেন, মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে। এখনো পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি, তবে এলাকায় পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।

এবিষয়ে পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকতা ও স্থানীয় সংসদ সদস্য জানান, শামীমের আস্তানায় যারা হামলা ভাংচুর অগ্নিসংযোগ ও শামীমকে হত্যা করেছে। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। একইসাথে এই এলাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা মোতায়েন রাখা হবে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, হামলার পর গুরুতর আহত অবস্থায় শামীমকে দৌলতপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। এ ঘটনায় শামীমের কয়েকজন অনুসারীও আহত হয়েছেন। তবে তারা বর্তমানে পলাতক রয়েছে।

অভিযুক্ত শামীম স্থানীয়ভাবে ভণ্ড পীর হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তার বিরুদ্ধে নিজেকে কখনও আল্লাহ, কখনও নবী বা ভগবান দাবি করার অভিযোগ রয়েছে। এসব কর্মকাণ্ডের কারণে দীর্ঘদিন ধরে এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছিল।

স্থানীয়দের দাবি, শামীম ইসলামবিরোধী বক্তব্য প্রচার করে আসছিলেন এবং নিজস্ব ব্যাখ্যায় ধর্মীয় বিধান তুলে ধরে অনুসারীদের বিভ্রান্ত করতেন। তিনি নামাজ, রোজা, হজ ও যাকাতসহ ইসলামের মৌলিক ইবাদতগুলো অস্বীকার করে ভিন্নধর্মী মতবাদ প্রচার করতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এমনকি অনুসারীদের হজ পালনের জন্য মক্কায় না গিয়ে স্থানীয় একটি বাঁশ বাগানের দরবারে যাওয়ার নির্দেশ দিতেন।

এছাড়াও, তার অনুসারীদের দাফনের সময় প্রচলিত ইসলামী বিধান উপেক্ষা করে ঢাকঢোল বাজানো, ‘হরে শামীম’ ধ্বনি দেওয়া এবং বিভিন্ন অস্বাভাবিক আচারের প্রচলনের অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, তিনি প্রকাশ্যে পবিত্র কুরআন সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্য করেছেন, যা ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।

জানা গেছে, ঘটনার দিন সকাল থেকেই তার কর্মকাণ্ড নিয়ে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের আগেই ক্ষুব্ধ জনতা তার আস্তানায় হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। এসময় শামীম ঈ তার কয়েকজন অনুসারীকে বেধড়ক মারধর করে। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শামীমের মৃত্যু হয়।

জানা গেছে, শামীম রেজা ঢাকায় মাস্টার্স সম্পন্ন করে দীর্ঘদিন শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। পরবর্তীতে এলাকায় ফিরে এসে একটি আস্তানা গড়ে তোলেন এবং ধীরে ধীরে বিতর্কিত ধর্মীয় কার্যক্রম শুরু করেন।

উল্লেখ্য, এর আগেও ২০২১ সালের মে মাসে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতসহ বিভিন্ন অভিযোগে তার বিরুদ্ধে দৌলতপুর থানায় মামলা দায়ের হয়। সে সময় পুলিশ অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠায়। দীর্ঘদিন কারাভোগের পর মুক্তি পেয়ে তিনি পুনরায় একই ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন বলে অভিযোগ রয়েছে।



banner close
banner close