ফেনীতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো)। একটি বৃহৎ সেচ প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের ঘটনা উদঘাটিত হয়েছে। ৫৬২ কোটি টাকার মুহুরী সেচ ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন প্রকল্পে অন্তত ২০০ কোটি টাকা লোপাট করা হয়েছে বলে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, নদী থেকে ফসলি জমিতে পানি সরবরাহের লক্ষ্যে স্থাপিত ৮৫০টি সেচ পাম্পের মধ্যে ৩৩৩টির কোনো অস্তিত্বই পাওয়া যায়নি। অবশিষ্ট পাম্পগুলোর বড় অংশ অকার্যকর অথবা নিম্নমানের সরঞ্জাম দিয়ে চালু রাখা হয়েছে। প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল ১৮ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা নিশ্চিত করা, কিন্তু বাস্তবে তা নেমে এসেছে মাত্র প্রায় ৩ হাজার হেক্টরে—যা লক্ষ্যমাত্রার এক-ষষ্ঠাংশেরও কম।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, প্রকল্পে কখনোই ঘোষিত সংখ্যক সেচ স্কিম বাস্তবে চালু হয়নি; কাগজে-কলমে সম্পন্ন দেখিয়ে প্রকল্প সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। এতে বৈদেশিক অর্থের অপচয়ের পাশাপাশি সরকারকে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রদান করা হয়েছে বলেও অভিযোগ ওঠে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের অর্থায়নে প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়। এতে ৫৩৪ কিলোমিটার ভূগর্ভস্থ পাইপলাইন স্থাপন এবং ৮৫০টি সেচ পাম্প চালুর পরিকল্পনা ছিল। ফেনীর পাঁচটি উপজেলা ও চট্টগ্রামের মীরসরাই এলাকায় প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা থাকলেও বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।
তদন্তে উঠে এসেছে, অধিকাংশ সেচ পাম্প অচল এবং অনেক ক্ষেত্রে পাইপলাইনের কোনো অস্তিত্বই শনাক্ত করা যায়নি। নিম্নমানের পাইপ ব্যবহারের কারণে দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অবকাঠামো। ডিস্ট্রিবিউশন লাইনের সঠিক নকশা না থাকায় মাটির নিচে স্থাপন করা পাইপের অবস্থান নির্ধারণ করাও সম্ভব হয়নি।
অবকাঠামো নির্মাণেও ব্যাপক অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে। নিম্নমানের ইট ও নির্মাণসামগ্রী দিয়ে পাম্পহাউজ, হেডার ট্যাংকসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। ছোট আকারের এয়ারভেন্ট তৈরি করায় পানি উপচে পড়ে এবং সেচ ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়ে। ফিটিংস, ওয়্যারিং ও অন্যান্য যন্ত্রাংশেও নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।
তদন্ত কমিটির তথ্য অনুযায়ী, একটি সেচ স্কিমও পুরোপুরি ত্রুটিমুক্ত নয়। যেখানে প্রতি পাম্পের আওতায় ২০ হেক্টর জমিতে সেচ দেওয়ার কথা, সেখানে বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে ৭-৮ হেক্টর জমিও সেচের আওতায় আসেনি। সরেজমিন পরিদর্শনে ৫৯১টি সেচ স্কিম বন্ধ অবস্থায় পাওয়া গেছে।
তদন্ত কমিটির সদস্য ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল্লাহ মামুন জানান, ৩৩৩টি পাম্পের বরাদ্দ অর্থ থেকে প্রকল্প পরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ঠিকাদারদের মাধ্যমে বড় অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। তার ভাষ্য, “অন্তত ২০০ কোটি টাকা লোপাট করা হয়েছে, যা সুদসহ ভবিষ্যতে পরিশোধ করতে হবে।
প্রকল্প বাস্তবায়নে দরপত্র প্রক্রিয়াতেও গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিতে প্রাক্কলিত মূল্যের চেয়ে বেশি দরে কাজ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং কাজের অগ্রগতির তুলনায় অতিরিক্ত বিল প্রদান করে কমিশন নেওয়া হয়েছে।
একটি সাবস্টেশন স্থাপনের ক্ষেত্রে ২৫-৩০ কোটি টাকার কাজের বিপরীতে ৪৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া একটি বিদেশি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে প্রাক্কলিত মূল্যের চেয়ে ১৩ শতাংশ বেশি দামে কাজ দেওয়া হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
তদন্তে ১৬ জন কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলেও বিভাগীয় মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদনে তাদের দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। এতে তদন্তের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রয়োজনীয় নথিপত্রের অভাব দেখিয়ে দায়ীদের রক্ষা করা হয়েছে।
বিভাগীয় তদন্ত কমিটির প্রধান জানান, অনিয়মের বিষয়ে ধারণা থাকলেও দালিলিক প্রমাণের অভাবে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, অফিশিয়ালি অনিয়মের বিষয়টি জানা থাকলেও কাগজে-কলমে প্রমাণ করা যায়নি।
তবে সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তারা এই ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাদের মতে, প্রকল্পের প্রতিটি ধাপে অনিয়মের ছাপ স্পষ্ট, যা একটি সুপরিকল্পিত দুর্নীতির ইঙ্গিত দেয়।,
প্রকল্প পরিচালক রাফিউস সাজ্জাদ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ভিত্তিহীন এবং ব্যক্তিগত বিরোধের ফল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিনির্ভর অঞ্চলে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সেচ প্রকল্প ব্যর্থ হওয়া শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই নয়, বরং খাদ্য উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। প্রকল্পটি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে বিপুল পরিমাণ ধান উৎপাদন সম্ভব হতো এবং কৃষকদের জীবনমান উন্নত হতো।
তদন্ত প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনার সুপারিশ করা হয়েছে। অন্যথায় ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতি রোধ করা কঠিন হবে বলে সতর্ক করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
আরও পড়ুন:








