বায়ুদূষণে বহুদিন ধরেই শীর্ষ আলোচনায় থাকা রাজধানী ঢাকাকে ছাড়িয়ে দেশের আরও কয়েকটি শহরে পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। গত ২ থেকে ৮ এপ্রিল পর্যন্ত সাত দিনের বায়ুমান সূচক (একিউআই) বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চট্টগ্রাম, গাজীপুর, রাজশাহী, সাভার, ময়মনসিংহ, বগুড়া ও টঙ্গী—এই সাত শহর অধিকাংশ দিনই দূষণে ঢাকাকে পেছনে ফেলেছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের সম্প্রসারিত বায়ুমান পর্যবেক্ষণ কার্যক্রমের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, এই সাত দিনের গড় একিউআই স্কোরে ঢাকার অবস্থান ছিল ১৫৩.৭১। অন্যদিকে চট্টগ্রামে ১৫৫.৮৬, সাভারে ১৫৫.৭১, ময়মনসিংহে ১৬১.২৮ এবং টঙ্গীতে ১৬৩.১৪ স্কোর রেকর্ড করা হয়েছে। রাজশাহীতে ছয় দিনের গড় স্কোর ১৫৬ হলেও বৃষ্টির কারণে ৮ এপ্রিল তা কমে ৮৫-এ নামায় সাত দিনের গড় দাঁড়ায় ১৪৬।
তথ্য ঘাটতির কারণে গাজীপুরের পাঁচ দিনের গড় স্কোর ছিল ১৫৩.২। তবে সবচেয়ে উদ্বেগজনক অবস্থানে রয়েছে বগুড়া, যেখানে সাত দিনের গড় একিউআই দাঁড়িয়েছে ১৭৪.৬—যা দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ এবং ‘অস্বাস্থ্যকর’ মাত্রার অনেক ওপরে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একিউআই ১০১ থেকে ১৫০ হলে তা সংবেদনশীল জনগোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর এবং ১৫০ ছাড়ালে তা সবার জন্যই ক্ষতিকর। সে হিসেবে উল্লিখিত শহরগুলোর বাতাস জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে।
এদিকে পরিবেশ অধিদপ্তর বর্তমানে দেশের ২৬টি এলাকার বায়ুমানের তথ্য প্রকাশ করলেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলের তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা হচ্ছে না। যেমন, সিলেটে সাত দিনের মধ্যে মাত্র দুই দিনের তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। একইভাবে নারায়ণগঞ্জের মতো দূষণপ্রবণ এলাকার তথ্যও অনুপস্থিত।
বায়ুমান বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম এখনও ঢাকাকেন্দ্রিক। সারা দেশে এই কার্যক্রম বিস্তৃত করা গেলে প্রকৃত পরিস্থিতি আরও পরিষ্কারভাবে জানা যেত এবং দূষণের উৎস নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সহজ হতো।
গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের বায়ুদূষণের একটি বড় অংশই আন্তসীমান্ত উৎস থেকে আসে। পরিবেশ গবেষণা সংস্থা Environment and Social Development Organization-এর গবেষণায় উঠে এসেছে, প্রতিবেশী দেশ ভারত ও মিয়ানমার থেকে আসা দূষিত বায়ুও বাংলাদেশের বায়ুমানকে প্রভাবিত করছে।
স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ও ক্যাপস-এর পরিচালক অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার জানান, দেশের মোট বায়ুদূষণের প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশই আন্তসীমান্ত দূষণের ফল। অক্টোবর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত উত্তর ভারতে খড় পোড়ানো, বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্গমন এবং দূরবর্তী অঞ্চল যেমন মঙ্গোলিয়া ও ইরান থেকে আসা ধূলিকণা দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে দূষণ বাড়িয়ে দেয়।
অন্যদিকে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে তুলনামূলকভাবে দূষণ কম। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, যশোরে সাত দিনের গড় একিউআই ৭৮.১৪—যা তুলনামূলকভাবে সহনীয়। এছাড়া সাতক্ষীরার শ্যামনগর, কক্সবাজার ও বরিশালেও দূষণের মাত্রা তুলনামূলক কম রয়েছে।
সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বায়ুমান পর্যবেক্ষণ প্রতিষ্ঠান আইকিউএয়ারের-এর বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে বিশ্বের দূষিত দেশের তালিকায় শীর্ষে ছিল পাকিস্তান এবং দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল বাংলাদেশ। আগের বছরগুলোতেও একই ধারা বজায় ছিল, যা দেশের বায়ুদূষণ পরিস্থিতির দীর্ঘস্থায়ী সংকটকে নির্দেশ করে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আন্তসীমান্ত সহযোগিতা জোরদার করার পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরে ধুলা নিয়ন্ত্রণ, নির্মাণকাজে বিধিনিষেধ এবং শিল্প কারখানার নির্গমন নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে।
আরও পড়ুন:








