দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া কয়লাখনিতে ধারণক্ষমতার প্রায় দ্বিগুণ কয়লা মজুদ হয়ে পড়েছে। প্রতিদিন প্রায় সাড়ে ৩ হাজার টন কয়লা উত্তোলন হলেও তাপ-বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহার হচ্ছে মাত্র ৭০০–৭৫০ টন। ফলে উত্তোলন ও ব্যবহারের মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য তৈরি হয়ে ইয়ার্ডে অতিরিক্ত কয়লা জমে ঝুঁকি ও আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা বাড়ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, খনির ১৩০৯ নম্বর ফেইস থেকে নিয়মিত কয়লা উত্তোলন অব্যাহত থাকলেও বিদ্যুৎকেন্দ্রের মাত্র একটি ইউনিট চালু থাকায় চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির ইয়ার্ডের ধারণক্ষমতা ২ লাখ ২২ হাজার টন হলেও গত ২৯ মার্চ পর্যন্ত সেখানে প্রায় ৫ লাখ ২০ হাজার টন কয়লা মজুদ রয়েছে।
আগে ৫২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার তিনটি ইউনিট চালু থাকায় প্রতিদিন ৪–৫ হাজার টন কয়লার চাহিদা ছিল। বর্তমানে মাত্র ১২৫ মেগাওয়াটের একটি ইউনিট চালু থাকায় চাহিদা এক-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে। এতে উৎপাদিত কয়লার বড় অংশ অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে।
২০১৯ সালের পর থেকে বড়পুকুরিয়ার কয়লার একমাত্র ক্রেতা হিসেবে তাপ-বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্ধারিত হওয়ায় খোলাবাজারে বিক্রির সুযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। আগে টেন্ডারের মাধ্যমে বাইরের ক্রেতাদের কাছে কয়লা বিক্রি করা যেত, ফলে মজুদ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হতো। বর্তমানে একক ক্রেতানির্ভরতার কারণে সেই ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে।
অন্যদিকে, চাহিদা কমলেও উৎপাদন বন্ধ করা যাচ্ছে না। বিদেশি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তির কারণে নিরবচ্ছিন্ন উত্তোলন চালিয়ে যেতে হচ্ছে। খনি কর্তৃপক্ষ বলছে, মাঝপথে উত্তোলন বন্ধ করলে ভূগর্ভস্থ নিরাপত্তা ও কারিগরি জটিলতা তৈরি হতে পারে।
অতিরিক্ত মজুদ থেকে নানা ঝুঁকির সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘদিন স্তূপ করে রাখা কয়লায় স্বতঃস্ফূর্ত আগুন লাগার ঘটনা ঘটছে, এতে কয়লা পুড়ে আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। পাশাপাশি উঁচু স্তূপের কারণে ধসের ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় প্রাণহানির আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
এ সংকটের জন্য খনি ও বিদ্যুৎকেন্দ্র কর্তৃপক্ষ একে অপরকে দায়ী করছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, উত্তোলন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার অনুরোধ জানানো হলেও তা মানা হয়নি। অন্যদিকে খনি কর্তৃপক্ষ বলছে, চুক্তির বাধ্যবাধকতার কারণে উৎপাদন বন্ধ রাখা সম্ভব নয় এবং বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়মিত কয়লা না নেওয়াতেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি মূলত দুই পক্ষের সমন্বয় ঘাটতির ফল।
বড়পুকুরিয়া তাপ-বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রধান প্রকৌশলী আবু বক্কর সিদ্দিক জানান, বর্তমানে ১২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার ১ নম্বর ইউনিট চালু রয়েছে, যেখানে প্রতিদিন প্রায় সাড়ে ৭০০ টন কয়লা প্রয়োজন। ২৭৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার ৩ নম্বর ইউনিটটি ওভারহোলিংয়ের কারণে বন্ধ থাকলেও আগামী মে মাসের শেষে চালু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এটি চালু হলে দৈনিক প্রায় ৩ হাজার টন কয়লার চাহিদা তৈরি হবে এবং বর্তমান মজুদ ৭–৮ মাসে শেষ হতে পারে।
অন্যদিকে, খনি কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, চীনের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে চুক্তি অনুযায়ী উত্তোলন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে, যা মাঝপথে বন্ধ করা সম্ভব নয়। খনির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. শাহ আলম জানান, অতিরিক্ত মজুদের কারণে ইয়ার্ডে বড় বড় স্তূপ তৈরি হয়েছে এবং আগুন নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিশেষ দল সার্বক্ষণিক কাজ করছে।
উল্লেখ্য, বড়পুকুরিয়া তাপ-বিদ্যুৎকেন্দ্রের তিনটি ইউনিটের মোট উৎপাদনক্ষমতা ৫২৫ মেগাওয়াট। এর মধ্যে একটি ইউনিট দীর্ঘদিন বন্ধ এবং আরেকটি যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বন্ধ রয়েছে। বর্তমানে চালু থাকা একমাত্র ইউনিট থেকেও পূর্ণ ক্ষমতায় উৎপাদন হচ্ছে না, ফলে কয়লার ব্যবহার কমে এই সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে।
আরও পড়ুন:








