ঈদের পরপরই রাজধানীর বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতি দেখা দিয়েছে। সরবরাহ সংকট ও পরিবহন ব্যয়ের চাপকে কারণ হিসেবে দেখিয়ে ব্যবসায়ীরা মুরগি, মাছ, মাংস ও সবজির দাম বাড়িয়েছেন। এতে ক্রেতাদের ভোগান্তি বেড়েছে, অন্যদিকে বিক্রিও কমে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন বিক্রেতারা।
রাজধানীর কারওয়ান বাজার, হাতিরপুল, রামপুরা ও মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট ঘুরে দেখা যায়, মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে বেশ কিছু পণ্যের দাম কেজিতে ৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। গরুর মাংস ৭৫০ টাকা থেকে বেড়ে ৮২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খাসির মাংস কেজিপ্রতি ১ হাজার ২০০ টাকা। ব্রয়লার মুরগি ১৭০ টাকা থেকে বেড়ে ২২০-২৩০ টাকায় উঠেছে। সোনালি মুরগি ৪২০ টাকা এবং দেশি মুরগি ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরবরাহ কমে যাওয়ায় তারা বেশি দামে পণ্য কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। কারওয়ান বাজারের এক মুরগি বিক্রেতা জানান, দাম বাড়ার কারণে বিক্রি প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। আগে যেখানে প্রতিদিন কয়েক হাজার মুরগি বিক্রি হতো, এখন তা নেমে এসেছে প্রায় এক হাজারে।
তাদের মতে, মূল সমস্যা সরবরাহে। পর্যাপ্ত মুরগি বাজারে আসছে না, বিশেষ করে সোনালি ও দেশি মুরগির সংকট বেশি। পরিবহন সংকটের কারণে আগের মতো নিয়মিত গাড়ি না আসাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।
তবে উৎপাদক ও খামারিদের দাবি ভিন্ন। তাদের মতে, উৎপাদনে বড় কোনো ঘাটতি নেই, বরং জ্বালানি সংকটের কারণে পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় বাজারে সরবরাহ কমে যাচ্ছে। পাশাপাশি আগের লোকসান ও খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে অনেক ক্ষুদ্র খামারি উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছেন।
বাংলাদেশ পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএ) নেতারা জানান, ফিডের দাম বাড়া ও ধারাবাহিক লোকসানের কারণে অনেক খামার বন্ধ হয়ে গেছে। এতে উৎপাদন কমেছে। অন্যদিকে পোলট্রি শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কাঁচামাল আমদানিনির্ভর হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে দামের প্রভাব পড়ছে দেশীয় বাজারে। ইতোমধ্যে ফিডের দাম কেজিতে কিছুটা বেড়েছে, যা সামনে আরও বাড়তে পারে।
মুরগির পাশাপাশি মাছের বাজারেও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। রুই ও কাতলা মাছ ৩০০ থেকে ৪৮০ টাকা, পাবদা ৬৫০, টেংরা ৭৫০, চিংড়ি ১ হাজার ২০০ এবং রূপচাঁদা প্রায় দেড় হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তেলাপিয়া ৩০০ টাকা, পাঙাশ ২২০-২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
সবজির বাজারেও স্বস্তি নেই। অধিকাংশ সবজি ৮০ থেকে ১২০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। ঢেঁড়স, বরবটি ১০০ টাকা, করলা, ঝিঙা, চিচিঙ্গা ১২০ টাকা, বেগুন ৮০ টাকা, মরিচ ১২০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। লাউ ও কুমড়ার দাম তুলনামূলক কম, কেজি ৬০ টাকা।
দাম বাড়ার চাপ সবচেয়ে বেশি পড়ছে সাধারণ ভোক্তাদের ওপর। অনেকেই বাধ্য হয়ে খাদ্যতালিকায় পরিবর্তন আনছেন। কারওয়ান বাজারে আসা এক ক্রেতা বলেন, আগে যে টাকায় এক সপ্তাহের বাজার করা যেত, এখন সেই টাকায় অর্ধেকও কেনা সম্ভব হচ্ছে না।
বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এবং দুর্বল সরবরাহ ব্যবস্থার সম্মিলিত প্রভাবে বাজারে এ অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। মজুদ ব্যবস্থাপনা ও সুষ্ঠু সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন তারা।
ঈদের পর সাধারণত বাজারে স্বস্তি ফেরার প্রবণতা থাকলেও এবার তার ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে। ফলে ক্রেতাদের জীবনে স্বস্তির বদলে অস্বস্তিই বাড়ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই চাপ আরও তীব্র হতে পারে।
আরও পড়ুন:




.jpg)



