শনিবার

২১ মার্চ, ২০২৬ ৭ চৈত্র, ১৪৩২

শোলাকিয়া ঈদগাহ: দুই শতাব্দীর ঐতিহ্য ও নিরাপত্তার চাদরে ১৯৯তম জামাত

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২১ মার্চ, ২০২৬ ০৯:২৬

শেয়ার

শোলাকিয়া ঈদগাহ: দুই শতাব্দীর ঐতিহ্য ও নিরাপত্তার চাদরে ১৯৯তম জামাত
ছবি সংগৃহীত

কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠে আজ ২১ মার্চ অনুষ্ঠিত হয়েছে ১৯৯তম পবিত্র ঈদুল ফিতরের জামাত। প্রায় দুই শতাব্দী ধরে নিরবিচ্ছিন্ন এই জমায়েত উপমহাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন ও বৃহত্তম ঈদের জামাত হিসেবে বিবেচিত। সকাল ১০টায় শুরু হওয়া জামাতে ইমামতি করেন কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের বড় বাজার মসজিদের খতিব মুফতি আবুল খায়ের মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ। এতে দেশ-বিদেশের প্রায় পাঁচ লাখ মুসল্লি অংশগ্রহণ করেন বলে ধারণা করছে স্থানীয় প্রশাসন। ঈদের এই জামাতকে ঘিরে চার স্তরের নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

কিশোরগঞ্জ শহরের পূর্বপাশে নরসুন্দা নদীর তীরে সাড়ে সাত একর জায়গায় অবস্থিত এই ঈদগাহ মাঠ। ১৮২৮ সালে ধর্মপ্রচারক সৈয়দ আহাম্মদ (রহ.) এ মাঠে প্রথম বৃহৎ জামাতে ইমামতি করেন। জনশ্রুতি আছে, ওই জামাতে সোয়া লাখ মুসল্লি অংশ নেন, যা থেকেই সোয়ালাখিয়া নামের উৎপত্তি; কালক্রমে তা শোলাকিয়া নামে পরিচিতি লাভ করে। বীর ঈশা খাঁর ষষ্ঠ বংশধর দেওয়ান হয়বত খান কিশোরগঞ্জে জমিদারি প্রতিষ্ঠার পর এই ঈদগাহের গোড়াপত্তন করেন। পরবর্তীকালে ১৯৫০ সালে হয়বতনগরের জমিদার দেওয়ান মান্নান দাদ খান সাড়ে তিন একর জমি ওয়াকফ করে দিলে মাঠের আয়তন বাড়তে থাকে। জমিদারি আমলে ঘোড়ার গাড়ি, নৌকা ও সিংহাসনে চড়ে জমিদাররা এখানে নামাজ পড়তে আসতেন, যা ছিল দূরদূরান্তের মুসল্লিদের জন্য বিশেষ আকর্ষণ।

ঐতিহ্যবাহী এই জামাতকে ঘিরে নিরাপত্তায় এবার মোতায়েন করা হয়েছে ১ হাজার ১০০ পুলিশ সদস্য। এছাড়া র্যাবের ছয়টি টিম, পাঁচ প্লাটুন বিজিবি, চার প্লাটুন সেনাবাহিনী ও পাঁচ প্লাটুন আনসার সদস্য নিরাপত্তায় কাজ করছে। মাঠে চারটি ওয়াচটাওয়ার এবং আশপাশের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে ৬৪টি ক্লোজড-সার্কিট ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। ড্রোন ক্যামেরার পাশাপাশি ঢাকা থেকে আগত বোম ডিসপোজাল টিম সার্বক্ষণিক তৎপর রয়েছে। ২৮টি প্রবেশপথে হ্যান্ড মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে আগত মুসল্লিদের দেহ তল্লাশি করে ঈদগাহে প্রবেশের ব্যবস্থা করা হয়।

মুসল্লিদের যাতায়াত সুবিধার্থে কিশোরগঞ্জ-ময়মনসিংহ ও ভৈরব-কিশোরগঞ্জ রুটে শোলাকিয়া এক্সপ্রেস নামে দুটি বিশেষ ট্রেন চালানো হয়। ঈদের আগের দিন থেকে শহরের সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ রাখা হয়। নিরাপত্তায় মাঠ ও আশপাশের এলাকায় ছয়টি অ্যাম্বুলেন্সসহ মেডিকেল টিম, ফায়ার সার্ভিসের ইউনিট ও ১০ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করেন। ঈদগাহ পরিচালনা কমিটি মুসল্লিদের শুধু জায়নামাজ নিয়ে মাঠে আসার অনুরোধ জানিয়েছে।

২০১৬ সালের ৭ জুলাই শোলাকিয়া ঈদগাহের কাছে পুলিশের নিরাপত্তা চৌকিতে জঙ্গি হামলায় দুই পুলিশ সদস্যসহ চারজন নিহত হন। ওই ঘটনার পর থেকে এ ঈদ জামাতে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়। বর্তমান ব্যবস্থায় নজিরবিহীন কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে মুসল্লিদের মাঠে প্রবেশ করতে হচ্ছে।

শোলাকিয়া ঈদগাহের ইতিহাস ও বর্তমান আয়তনের বিষয়টি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দিনাজপুরের গোর-এ-শহীদ ঈদগাহ ময়দান আয়তনে বড় হলেও শোলাকিয়ার প্রায় দুই শতাব্দীর ধারাবাহিক ঐতিহ্য ও ইতিহাস তাকে স্বতন্ত্র মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছে। স্থানীয় লোকজনের অভিমত, ঐতিহ্য ও সুনাম অনুযায়ী এ মাঠের অবকাঠামোগত উন্নয়ন এখনো পর্যাপ্ত নয়। তারা এই ঐতিহাসিক ঈদ জামাতকে ইউনেস্কোর স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।



banner close
banner close