রবিবার

৩০ আগস্ট, ২০২৬ ১৫ ভাদ্র, ১৪৩৩

রাকাবের ডিজিএমের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও নারী কেলেঙ্কারির অভিযোগ: তদন্তে বাংলাদেশ ব্যাংক

রাজশাহী প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ৭ মার্চ, ২০২৬ ১১:৫৮

শেয়ার

রাকাবের ডিজিএমের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও নারী কেলেঙ্কারির অভিযোগ: তদন্তে বাংলাদেশ ব্যাংক
ছবি সংগৃহীত

রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের (রাকাব) প্রধান কার্যালয়ের আইসিটি সিস্টেম বিভাগের উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) আরিফুজ্জামানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ঘুষ গ্রহণ, নারী কেলেঙ্কারি এবং সহকর্মীদের সাথে অসদাচরণের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংক বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের রাজশাহী অফিস থেকে রাকাবের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে এক পত্রের মাধ্যমে বিষয়টি তদন্ত করে ২৬ ফেব্রুয়ারি তারিখের মধ্যে মতামত প্রদানের নির্দেশ দেয়া হয়। আরিফুজ্জামানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে গত ২ মার্চ তাকে রাকাব প্রধান কার্যালয়ের আইসিটি সিস্টেম বিভাগের উপ-ব্যবস্থাপক থেকে রংপুর বিভাগীয় কার্যালয়ের উপ-ব্যবস্থাপক হিসেবে বদলি করা হয়।

শুক্রবার (৬ মার্চ) দুপুরে বাংলা এডিশনের প্রতিবেদককে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন রাকাবের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. ইফতেখার জাহিদ। প্রতিবেদককে তিনি জানান, গত ২ মার্চ ডিজিএম আরিফুজ্জামান মহোদয়ের একটি বদলি আদেশ হয়েছে। তবে কি কারণে এ বদলি তা আমাদের জানা নেই।

ব্যাংক কর্মী মো. জহিরের দাখিলকৃত অভিযোগে বলা হয়েছে, আরিফুজ্জামান আইসিটি বিভাগে যোগদানের পর থেকেই বিভিন্ন বিল পাসের বিপরীতে মোটা অঙ্কের কমিশন গ্রহণ করে আসছেন। এর আগে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছে ৩০ লক্ষ টাকা ঘুষ দাবি করায় তাকে শাস্তিস্বরূপ রংপুরে বদলি করা হয়েছিল। এছাড়া তিনি ভ্রমণ না করেই ভুয়া ভ্রমণ বিল তৈরি করে ব্যাংকের অর্থ আত্মসাৎ করেছেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, রংপুরে থাকাকালীন তিনি অসামাজিক কাজে লিপ্ত অবস্থায় হাতেনাতে ধরা পড়েন এবং দুই লক্ষ টাকার বিনিময়ে বিষয়টি রফাদফা করেন। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে কালিয়াডাঙ্গায় আবারও একই ধরনের ঘটনায় ধরা পড়ে এক লক্ষ টাকার বিনিময়ে পার পান। এছাড়া কর্মস্থলে একাধিক নারী সহকর্মীর সাথে তার অনৈতিক সম্পর্ক এবং তাদের অনৈতিক সুবিধা প্রদানের অভিযোগও পত্রে বিস্তারিতভাবে জানানো হয়েছে।

এছাড়াও আরিফুজ্জামানের বিরুদ্ধে একাধিক নারীঘটিত অভিযোগ সহ ২০১৯ সালে এক কোটি টাকা ঘুষ লেনদেনের অভিযোগে তাকে রাকাবের প্রধান কার্যালয়ের আইসিটি বিভাগ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে রংপুর বিভাগে শাস্তিমূলক বদলিও হয়েছিলেন তিনি।

অভিযোগ অনুযায়ী, আরিফুজ্জামান ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ওয়াহিদা বেগমের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ৪০ লক্ষ টাকার বিনিময়ে কর্মকর্তাদের এসিআর টেম্পারিং করে অবৈধ পদোন্নতির ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এমনকি গত ৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের শহীদ আবু সাঈদ ও মুগ্ধর ছবি সংবলিত ব্যানার ছিঁড়ে ফেলে দেন তিনি। শুধু জুলাই যোদ্ধাদের-ই নয়, এমডি ওয়াহেদার প্রিয় পাত্র হওয়ার লক্ষ্যে তদকালীন সময়ে রাকাবে বিএনপি পন্থী অফিসার্স এশোসিয়েশনের সাটানো ৩১ দফা দাবি সংবলিত ব্যানারও তিনি ছিঁড়ে ফেলে দেন, যা নিয়ে স্থানীয় বিএনপি ও সাধারণ কর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল। এবং পরে এনিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে আরিফুজ্জামানের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ও সংবাদ সম্মেলনও করেন বিএনপির নেতাকর্মীরা।

ডিজিএম আরিফুজ্জামানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের উপ-পরিচালক মো. সাদিউল হাসান স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে বলা হয়েছে, আরিফুজ্জামানের বিরুদ্ধে ওঠা এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে সুস্পষ্ট বক্তব্য ও মতামত প্রদান করতে হবে। এই তদন্তের মাধ্যমে ব্যাংকটির শৃঙ্খলা এবং ইমেজ রক্ষা করা সম্ভব হবে বলে সাধারণ কর্মীরা আশা প্রকাশ করেছেন।

অভিযোগের বিষয়ে আইসিটি সিস্টেম বিভাগের উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) আরিফুজ্জামান বাংলা এডিশনকে বলেন, এসব বিষয় আমি নিজেও জানি না। আমি ছুটিতে আছি, মানসিকভাবে অসুস্থ এবং বিপর্যস্ত। আমি কিছু বলতে পারবো না। এগুলো অভিযোগ কতটা সঠিক আপনারা তদন্ত করে দেখতে পারেন। পর্বেও দুর্নীতি ও ঘুষ লেনদেনের কারণে আপনাকে তাৎক্ষণিক বদলি করা হয়েছিল। এমন অভিযোগও রয়েছে। এই ব্যাপারে আপনার অভিমত কি -প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ২০১৯ সালেও আমাকে এখান থেকে বদলি করা হয়েছে। পরে ২০২০ সালে আবার আমি এখানে এসেছি, চাকরি করেছি। ২০২১ সালে আবার আমাকে বদলি করা হয়। সম্প্রতি ২ তারিখ মধ্যরাতে আমাকে আবার বদলি আদেশ ধরিয়ে দেওয়া হয়। এসব আসলে কার স্বার্থে, কাদের ইশারায় হচ্ছে এটা আপনারাই খতিয়ে দেখেন, আমার কিছু বলার নেই।

তবে রাকাবের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) গোলাম মোরতজা বাংলা এডিশনের প্রতিবেদককে জানান, আইসিটি সিস্টেম বিভাগের উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) আরিফুজ্জামান এর বিরুদ্ধে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এটি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে করতে বলা হয়েছে। সেটির কাজ চলমান আছে। আমি যেহেতু এখানে নতুন এসেছি। তাই দেরি হয়েছে। তবে দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য আমরা চেষ্টা করব। তদন্তের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, যেহেতু তার বিরুদ্ধে তদন্ত চলমান আছে তাই তদন্তের স্বার্থে আমি তাকে বদলীও করেছি। আর তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত আপাতত কোনো মন্তব্য করবো না।

জানা গেছে, রাকাবের বদলি ঠেকাতে মরিয়া হয়ে দৌঁঝাপ করছেন সদ্য তাৎক্ষণিক বদলিকৃত রাকাব কর্মকর্তা আরিফুজ্জামান। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি তার সত্যতা শিকার না করলেও রাকাব চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী ঘটনার সত্যতা শিকার করে বলেন, তিনি টেলিফোন ও সরসরি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সহ অনেকের মাধ্যমেই অনুরোধ করছেন বদলি ঠেকানোর জন্য। কিন্তু এটা সম্ভব না। ব্যাংক তার নিজস্ব রুল এন্ড রেগুলেশনস এ চলে। এতে আমাদের করার কিছু নেই। তাছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের আদেশের বাইরে গিয়ে আমরা আগ বারিয়ে কোনো কাজও করতে পারি না বলে জানান রাকাব চেয়ারম্যান।