পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কল্যাণ তহবিলের অর্থ বরাদ্দে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের তীর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. কাজী রফিকুল ইসলামের দিকে।
জানা যায়, নীতিমালার কোনো রকম তোয়াক্কা না করে নিজের ঘনিষ্ঠ সহচরদের যত্রতত্র কল্যাণ তহবিলের অর্থ বরাদ্দ দিয়েছেন উপাচার্য। এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
সরকারি কর্মচারী কল্যাণ ফান্ড মূলত সরকারের রাজস্ব খাতভুক্ত কর্মরত, অবসরপ্রাপ্ত ও মৃত কর্মচারীদের (এবং তাদের পরিবারের) আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য। এর মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের অসুস্থতা, দুর্ঘটনা, মৃত্যুজনিত ক্ষতিপূরণ এবং বিভিন্ন বিশেষ অনুদান প্রদানের লক্ষ্যে তহবিলটি পরিচালিত হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কল্যাণ তহবিলের নীতিমালা অনুসারে, গুরুতর অসুস্থতায় শৈল চিকিৎসার জন্য এ তহবিল থেকে আবেদনের সাপেক্ষে সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা প্রদান করা যেতে পারে। পাশাপাশি কেউ যদি ‘চরম আর্থিক সংকটে’ পতিত হয়, তাহলে তাকে সর্বোচ্চ মূল বেসিকের দ্বিগুণ সমপরিমাণ অর্থ দেয়া যেতে পারে। এছাড়াও চাকুরিরত কারও মৃত্যু ঘটলে মাসিক ২ হাজার টাকা, মৃত্যু-পরবর্তী অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় ৩ হাজার টাকা এবং লাশ পরিবহনে ২ হাজার টাকা প্রদানের বিধান রয়েছে।
সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির কাছে আসা প্রাপ্ত তথ্যানুসারে, ২০২৫ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্ট্রার আমিনুল ইসলাম টিটু মায়ের অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে এক লক্ষ বিয়াল্লিশ হাজার টাকা (১,৪২,০০০ টাকা), চলতি বছরের ১১ জানুয়ারি ডেপুটি রেজিস্ট্রার শরীফ মেহেদী নিজের অসুস্থতার কারণে এক লক্ষ সতেরো হাজার টাকা (১,১৭,০০০ টাকা), ২০২৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর ডেপুটি রেজিস্ট্রার আবু বক্কর ছেলের অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে এক লক্ষ তেত্রিশ হাজার টাকা (১,৩৩,০০০ টাকা) এবং ২০২৫ সালের ২৮ মে সন্তানের অসুস্থতা বাবদ ডেপুটি রেজিস্ট্রার মো. শাহজালাল এক লক্ষ সাতাশ হাজার টাকা (১,২৭,০০০ টাকা) কল্যাণ তহবিল থেকে উত্তোলন করেন। এরা প্রত্যেকেই বর্তমান উপাচার্য ড. কাজী রফিকুল ইসলামের ঘনিষ্ঠজন বলে পরিচিত।
মূলত চাকরিরত অবস্থায় বা অবসরের পর গুরুতর অসুস্থতা এবং ‘চরম আর্থিক সংকটে’ সহায়তার জন্য এই তহবিল থাকলেও, এসব ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার এ তহবিল থেকে অর্থ প্রাপ্তির বিষয়টি স্পষ্টতই নিয়মের লঙ্ঘন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অভিযুক্ত কর্মকর্তারা স্থানীয় ও রাজনৈতিকভাবে বেশ প্রভাবশালী পরিবারের সদস্য। শুধু তাই নয়, পারিবারিকভাবে প্রত্যেকেই যথেষ্ট স্বচ্ছল ও স্বাবলম্বী। উপাচার্যের ঘনিষ্ঠ এসব কর্মকর্তারা সরকারি বেতন স্কেল ও বিভিন্ন ভাতাসহ প্রায় এক লক্ষ কিংবা তদূর্ধ্ব টাকার সমপরিমাণ বেতন পেলেও, কীভাবে তারা কল্যাণ তহবিলের এই অর্থ পেলেন—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিশ্ববিদ্যালয় জিয়া পরিষদের এক কর্মকর্তা জানান, “বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দৌরাত্ম্যে কয়েকজন কর্মকর্তার কল্যাণ তহবিলের অর্থ বরাদ্দের এসব অনিয়ম নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে আলোচনা হচ্ছে। স্বচ্ছল ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা যদি এভাবে কল্যাণ তহবিলের অর্থ উত্তোলন করেন, তবে তা তাদের নৈতিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে যে যার ইচ্ছামতো এ তহবিল থেকে অর্থ নিতে চাইবে।”
কল্যাণ তহবিল থেকে অর্থ উত্তোলনকারী কর্মকর্তা শরীফ মেহেদী বলেন, “আমি অনেক আর্থিক সংকটে ছিলাম। তাই নিজের অসুস্থতায় যথাযথ প্রক্রিয়ায় আবেদন করেই কল্যাণ তহবিল থেকে অর্থ উত্তোলন করেছি। এ বিষয়ে আরও কিছু জানার থাকলে অর্থ ও হিসাব শাখায় যোগাযোগ করতে পারেন। এর বেশি আমি আপনাদের কিছু বলতে পারব না।”
এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. কাজী রফিকুল ইসলাম বলেন, “আমি যথাযথ নিয়ম অনুযায়ী কল্যাণ তহবিলের এ অর্থ বরাদ্দ দিয়েছি। এখানে কোনো অনিয়ম হয়েছে বলে আমি মনে করি না। তারা তাদের লিখিত আবেদনে চরম আর্থিক সংকটে আছেন বলে উল্লেখ করেছিলেন। তাদের অভ্যন্তরীণ অবস্থা কেমন, সেটি আমার পক্ষে সব জানা সম্ভব নয়।”
আরও পড়ুন:








