চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর দীর্ঘদিন ধরেই পাহাড় দখল, অবৈধ বসতি ও প্লট বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সশস্ত্র সন্ত্রাসের অভয়ারণ্য। হাজার কোটি টাকার সরকারি খাস জমির নিয়ন্ত্রণকে ঘিরে এখানে বছরের পর বছর ধরে চলে আসছে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও খুনোখুনি। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার পতনের পর থেকে এই সহিংসতার মূল কেন্দ্রে রয়েছেন ইয়াসিন ও রুকন নামের দুই প্রভাবশালী গ্রুপের দীর্ঘদিনের আধিপত্যের লড়াই।
একসময় আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকা ইয়াসিন বর্তমানে বিএনপির পরিচয়ে এলাকায় সক্রিয়। অন্যদিকে রুকন উদ্দিন চট্টগ্রাম উত্তর জেলা যুবদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (বহিষ্কৃত)। সর্বশেষ তাদের গ্রুপিং ও আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্ব ভয়াবহ রূপ নেয় ওই এলাকায় বিএনপির একটি কার্যালয় উদ্বোধনকে কেন্দ্র করে।
সোমবার (১৯ জানুয়ারি) জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসীদের হামলায় র্যাবের উপসহকারী পরিচালক আবদুল মোতালেব নিহত হন। একই ঘটনায় র্যাবের আরও তিন সদস্য এবং মনা নামে একজন সোর্স গুরুতর আহত হন। পুলিশ, র্যাব ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সোমবার বিকেলে ইয়াসিনের নেতৃত্বে জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় একটি বিএনপি কার্যালয় উদ্বোধনের কথা ছিল। এ উপলক্ষে সেখানে বিপুলসংখ্যক লোকজন জড়ো হয়। অন্যদিকে রুকন গ্রুপের অনুসারী ও র্যাবের সোর্স মনা র্যাবকে জানান যে ওই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ইয়াসিন উপস্থিত থাকবেন। এই তথ্যের ভিত্তিতে চট্টগ্রাম র্যাবের পতেঙ্গা কোম্পানি থেকে একটি টিম সেখানে অভিযান পরিচালনার জন্য যায়।
বেলা পৌনে চারটার দিকে অভিযানে যাওয়া র্যাব সদস্যদের ওপর ইয়াসিন গ্রুপের অনুসারীরা হামলা চালায়। একপর্যায়ে র্যাবের চার সদস্য ও সোর্স মনাকে আটকে ফেলা হয়। এ সময় র্যাবের অন্য সদস্যরা ঘটনাস্থল থেকে সরে যান। আটকে রাখা সদস্যদের কাছ থেকে অস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে তাদের ওপর ব্যাপক মারধর করা হয়।
খবর পেয়ে সীতাকুণ্ড থানা পুলিশ উদ্ধার অভিযান শুরু করে এবং স্থানীয় একটি পক্ষের সহায়তা নেয়। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় পাঁচজনকে উদ্ধার করে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক র্যাবের উপসহকারী পরিচালক আবদুল মোতালেবকে মৃত ঘোষণা করেন। নিহত আবদুল মোতালেব বিজিবির নায়েব সুবেদার ছিলেন এবং ডেপুটেশনে র্যাবে কর্মরত ছিলেন। ঘটনার পর জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হলেও ঘটনার সঙ্গে জড়িত কাউকে তাৎক্ষণিকভাবে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।
সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মহিনুল ইসলাম বলেন, জঙ্গল সলিমপুরে বিএনপির একটি কার্যালয় উদ্বোধনকে কেন্দ্র করে লোকজন জড়ো হয়েছিল। খবর পেয়ে সেখানে সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারের জন্য র্যাবের একটি দল অভিযান চালায়। এ সময় দুর্বৃত্তরা র্যাবের ওপর হামলা চালিয়ে কয়েকজনকে আটক করে মারধর করে। পরে পুলিশ গিয়ে তাদের উদ্ধার করে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে ইয়াসিন সীতাকুণ্ডের সাবেক সংসদ সদস্য এস এম আল মামুনের আশ্রয়ে ছিলেন। তিনি আলীনগর বহুমুখী সমিতির নেতৃত্বে রয়েছেন। অন্যদিকে মহানগর ছিন্নমূল বস্তিবাসী সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে রয়েছেন কাজী মশিউর ও গাজী সাদেক। যারা প্লট কিনেছেন, তারা সবাই মূলত এই দুই সমিতির সদস্য। বর্তমানে এ দুটি সমিতিতে প্রায় ৩০ হাজার সদস্য রয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারের পতন হলে রুকন বাহিনীর সঙ্গে জোটবদ্ধ হয় মশিউররা। এরপর তারা ইয়াসিন বাহিনীর সঙ্গে একাধিকবার সংঘর্ষে লিপ্ত হয়।
জানা গেছে, সলিমপুর ইউনিয়নের জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় প্রায় চার দশক ধরে সরকারি পাহাড় ও খাস জমি দখল করে কয়েক হাজার অবৈধ বসতি গড়ে উঠেছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় এটি দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়খেকো, ভূমিদস্যু ও সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত। এলাকাটি এখনো সশস্ত্র পাহারায় নিয়ন্ত্রিত হয় এবং বহিরাগতদের প্রবেশ কার্যত নিষিদ্ধ।
জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, জঙ্গল সলিমপুরের মোট আয়তন প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর। লিংক রোডসংলগ্ন এই এলাকায় প্রতি শতক জমির বাজারমূল্য ৯ থেকে ১০ লাখ টাকা। সে হিসাবে দখল হয়ে থাকা সরকারি খাস জমির আনুমানিক মূল্য প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। এই বিপুল অর্থনৈতিক স্বার্থকে কেন্দ্র করেই এলাকায় বছরের পর বছর ধরে সংঘর্ষ, খুনোখুনি ও সন্ত্রাসী তৎপরতা চলমান রয়েছে।
এর আগেও একাধিকবার জঙ্গল সলিমপুরে উচ্ছেদ ও পাহাড় কাটা বন্ধে অভিযান চালাতে গিয়ে প্রশাসনের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। ২০২৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর উচ্ছেদ অভিযান শেষে ফেরার পথে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, থানার ওসি ও পুলিশ সদস্যসহ অন্তত ২০ জন আহত হন। ২০২২ সালেও র্যাব, পুলিশ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ওপর একাধিকবার হামলার ঘটনা ঘটে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, এলাকাটির ভৌগোলিক অবস্থান এমন যে বাহিনীর গাড়ি প্রবেশ করলেই পাহারাদারদের মাধ্যমে সন্ত্রাসীরা আগাম খবর পেয়ে যায়। এরপর পাহাড়ের ওপর থেকে গুলি, ককটেল ও ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। এককভাবে অভিযান চালিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়েছে।
উল্লেখ্য, জঙ্গল সলিমপুরের সরকারি খাস জমিতে কারাগার, আইটি পার্কসহ অন্তত ১১টি বড় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা থাকলেও জমি উদ্ধার না হওয়ায় কোনো প্রকল্পই এখনো বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি।
আরও পড়ুন:








