সম্প্রতি পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার বিতর্কিত ইউএনও'র নানাবিধ দুর্নীতি নিয়ে একটি বিশেষ অনুসন্ধান প্রকাশ করেছে পতাকা নিউজ। নিচে সম্পূর্ণ প্রতিবেদনটি তুলে ধরা হলো:
এমপি পদ শূন্য, নেই উপজেলা চেয়ারম্যান, শূন্য রয়েছে পৌর মেয়রের পদও। তাই সকল ক্ষমতার দেখভালের দায়িত্ব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও)। এ কারণে কাউকে থোরাই কেয়ার না করে লুটপাট আর গরিবের নামের বরাদ্দের মালামাল–অর্থকড়ি লুটপাট চলছে চোখ বুঝে। চাল সংগ্রহে অনিয়ম করে বাজারের নিম্নমানের চাল গুদামজাত করা হয়েছে। বিকল স্পিডবোট ব্যবহার না করেও স্পিডবোটের জ্বালানির ভাউচার দেখিয়ে তুলে নেয়া হয়েছে লাখ লাখ টাকা। গরিবের নামে বরাদ্দকৃত শীতবস্ত্র কেনার টাকায় শীতবস্ত্র না কিনে তা আত্মসাৎ করেছেন।
দুর্যোগকালীন সময়ে বরাদ্দকৃত অসহায় মানুষের ত্রাণের চাল বিক্রি করেও পকেট ফুলিয়েছেন। ২০২৫–২০২৬ অর্থবছরে রাজস্ব উন্নয়ন তহবিলের প্রায় ৯ কোটি ৫০ লাখ টাকার প্রকল্পে ব্যাপক লুটপাটের প্রমাণ পাওয়া গেছে। খাসজমিতে চাষের অনুমতি দিয়ে রাজস্ব জমা না দিয়ে কৃষকের কাছ থেকে ঘুষ নিয়েছেন প্রায় এক কোটি ২৫ লাখ টাকা। এছাড়াও ত্রাণ, টিআর, কাবিখা, কাবিটা এবং এডিবির কাজে অনিয়ম করে লুটপাটের প্রমাণ মিলেছে পতাকা নিউজের অনুসন্ধানে। আর এ লুটপাটকারী হচ্ছেন পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার ইউএনও আমিনুল ইসলাম। তার বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে ইতিমধ্যে ওই উপজেলায় তাঁর অপসারণের দাবিতে মানববন্ধনসহ ঝাড়ুমিছিল পর্যন্ত হয়েছে। পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলায় চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে পাওয়া তার আমলনামায় মিলছে শুধুই দুর্নীতির খতিয়ান।
শীতার্থদের অনুকূলে বরাদ্দের টাকা আত্মসাৎ
বাউফল পৌরসভার মেয়রের দায়িত্বে প্রশাসক হিসেবে রয়েছেন ইউএনও আমিনুল ইসলাম। অথচ গত শীত মৌসুমে গরিব মানুষের জন্য শীতবস্ত্র কিনে বিতরণের উদ্দেশ্যে ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয় দুই লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়। ওই টাকা দিয়ে শীতবস্ত্র না কিনে বরাদ্দের পুরো টাকাই আত্মসাৎ করেন আমিনুল। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের উপপরিচালক (ত্রাণ–১) ওই বছরের ১৯ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত একটি চিঠির মাধ্যমে দেশের ৬৪ জেলার ৩৩০টি পৌরসভায় মোট ৫ কোটি ৬৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয় শীতবস্ত্র কিনে বিতরণের জন্য। এর মধ্যে বাউফল পৌরসভাকে দেয়া হয় দুই লাখ টাকা।
শীতবস্ত্র কেনার টাকা পৌরসভার হিসাব নম্বরে জমা না দিয়ে মে মাসে অন্য একটি হিসাব নম্বরে জমা দিয়ে আত্মসাৎ করেন। পরে কম্বল কেনার বিল ভাউচার তৈরি করে অফিসিয়ালি জমা দেন। কিন্তু পৌরসভার ৯টি ওয়ার্ডে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে—কোথাও একটি কম্বলও বিতরণ করা হয়নি।
এ ব্যাপারে পৌরসভায় কর্মরত কোন কর্মকর্তা কর্মচারী কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি। ওই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মী বলেন, ‘উনি (ইউএনও স্যার) আমাদের বর্তমানে প্রশাসক, কেউ তার বিরুদ্ধে কম্বলের টাকা চুরি নিয়ে কথা বলবে না। কারণ এখানে যারা পদোন্নতি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে তাদের এসিআর ইউএনও স্যারের কাছে। এ ব্যাপারে তারা তথা বললে তাদের বারোটা বাজিয়ে দিবে। কম্বলের টাকা চুরির বিষয়টি সবাই জানে।’
ত্রাণের চাল চুরি
দুর্যোগকালীন বিতরণের জন্য বরাদ্দকৃত সাধারণ রিলিফ (জিআর) এর ২৩ মেট্রিক টন চাল চুরি করে বিক্রির প্রমাণ পাওয়া যায় পতাকা নিউজের অনুসন্ধানে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বিভিন্ন সময়ে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তারা বাউফল উপজেলায় মোট ২৭ মেট্রিক টন জিআর চাল বরাদ্দ দেন। এর বড় অংশই দুর্যোগ না থাকলেও বাস্তবে বিতরণ না করে মাস্টাররোল তৈরি করে দেখানো হয়েছে। উপজেলার ১২ ইউনিয়নের চেয়ারম্যানদের কাছ থেকে নাম–মাত্র বিতরণের তালিকা সংগ্রহ করেছেন ইউএনও।
সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বাউফল উপজেলার চলতি বর্ষা মৌসুমের দুর্যোগ মোকাবেলার জন্য ২৪ অক্টোবর জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা সুমন চন্দ্র দেবনাথ স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে পটুয়াখালী জেলার বিভিন্ন উপজেলায় মোট ৮০ মেট্রিকটন চাল বরাদ্দ দেয়। এরমধ্যে বাউফল উপজেলায় বরাদ্দ দেয়া হয় ১০ মেট্রিকটন জিআর। ২০২৫ সালের প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় আগাম এ চাল বরাদ্দ দেয়া হয়। একই উদ্দেশ্যে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা এসএম দেলোয়ার হোসেন ২৯ মে স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে ৮৪ মেট্রিকটন চাল বরাদ্দ দেন জেলার ৮ উপজেলায়। এরমধ্যে বাউফল উপজেলায় বরাদ্দ দেয়া হয় ১২ মেট্রিকটন জিআর এর চাল। আবার ৩১ মে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা এসএম দেলোয়ার হোসেন জেলার পাঁচ উপজেলায় ২৫ মেট্রিকটন জিআর চাল বরাদ্দ দেন। এরমধ্যে বাউফল উপজেলায় বরাদ্দ দেয়া হয় পাঁচ মেট্রিকটন চাল।
গত অর্থবছরের রিজার্ভ ১০টন এবং বর্তমান অর্থবছরের বরাদ্দসহ দুর্যোগকালীন জিআর মোট রিজার্ভ ছিল ২৭ মেট্রিকটন। প্রতিটি চিঠিতে দুর্যোগকালীন সময়ে অসহায় মানুষের মাঝে ওই চাল বিতরণের কথা উল্লেখ রয়েছে। চলতি বর্ষা মৌসুমে তেমন একটা প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়নি। তবে মে মাসের শেষের দিকে এবং জুন মাসে উত্তরাঞ্চলের ঢলের পানির তোড়ে এবং প্রায় একই সময়ে বঙ্গোপসাগরে কয়েকটি নিম্নচাপের প্রভাবে বাউফলের তেঁতুলিয়া নদী তীরবর্তী ধূলিয়া, নাজিরপুর এবং চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নের অংশ বিশেষ এলাকা জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়। ওইসব এলাকায় নাম মাত্র কিছু ত্রাণ বিতরণ করেছেন ইউএনও আমিনুল।
ত্রাণ না দিয়ে উপজেলার বাকি ১২ ইউনিয়নের চেয়ারম্যানদের কাছ থেকে মাস্টাররোল তৈরী করেন ত্রাণ বিতরণের নামে। ওই ১২ ইউপির চেয়ারম্যানদের মধ্যে ৭ জন চেয়ারম্যান পতাকানিউজকে জানান, ইউএনওর বিরুদ্ধে এ ব্যাপারে নাম প্রকাশ করে কথা বলতে পারবো না। ত্রাণ না দিয়েও তিনি আমাদের কাছ থেকে কোন ইউনিয়ন থেকে ৩০০ এবং কোন ইউনিয়ন থেকে ৪০০ এর অধিক ত্রাণ বিতরণের মাস্টাররোল তৈরী করে নিয়েছেন।
কালাইয়া খাদ্য গুদামের রেজিস্টারে পাওয়া গেছে—জুন–জুলাই মাসে ৮ টন এবং ১৫ টন জিআর চাল বিক্রি করা হয়েছে। সরকারি দর ছিল প্রতি টন ৫৮ হাজার টাকা। সে হিসেবে ২৩ মেট্রিক টন চালের মূল্য ১৩ লাখ ৩৪ হাজার টাকা আত্মসাৎ করেছেন ইউএনও আমিনুল।
চাল সংগ্রহে কোটি টাকার ঘুষবাণিজ্য
২০২৫ সালের বোরো চাল সংগ্রহে বাউফলে ১১৭৬ মেট্রিক টন চাল গুদামজাত করা হয়। এরমধ্যে বাউফল উপজেলার বগা খাদ্য গুদামে ৯৩৬ মেট্রিকটন এবং কালাইয়া খাদ্য গুদামে ৭৮০ মেট্রিকটন চাল গুদামজাত করা হয়। চলতি বছরের ২৪ এপ্রিল থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ওই বোরো সংগ্রহ চলে। অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী চাল সংগ্রহ কমিটির ওই উপজেলা সভাপতি ইউএনও। সব কিছু যাচাই বাছাইয়ের মূল দায়িত্ব ইউএনওর।
সরকারি নির্ধারিত দর—৪৯ টাকা কেজি। মোট ব্যয়—৫৭ কোটি ৬ লাখ ২৪ হাজার টাকা। কিন্তু নির্দেশনা অনুযায়ী চালের গুণগত মান বজায় রাখা হয়নি। তদন্তে দেখা গেছে— এক কেজি চালে ভাঙা দানা তিন ভাগের এক ভাগ। বাজারমূল্য সর্বোচ্চ ৩৬–৩৭ টাকা। গুণগত মানহীন চাল সংগ্রহ করে কেজি প্রতি ১৩ টাকা করে মোট ১ কোটি ৫২ লাখ ৮৮ হাজার টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।
এ ব্যাপারে চাল সংগ্রহের সাথে জড়িত কেউ কোন কথা বলতে রাজি হয় নি। নাম গোপন রাখার শর্তে উপজেলা খাদ্য অফিসে কর্মরত একজন বলেন, ‘সব করেছে ইউএনও স্যার জবাব তার কাছ থেকে নেন।’
রাজস্ব উন্নয়ন প্রকল্পে ঘুষ বাণিজ্য
২০২৫–২৬ অর্থবছরে রাজস্ব তহবিল থেকে ৫৬৪টি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এর মধ্যে বহু প্রকল্পে— অনিয়ম, নন–রেজিস্টার্ড প্রতিষ্ঠানকে কাজ, ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ পরিলক্ষিত হয়।
সরকারের বিধিতে সরকারি নিবন্ধনকৃত ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠানে সরকারের রাজস্ব তফবিল থেকে কোন উন্নয়নমূলক কাজ না করার বিধান থাকলেও তিনি তা মানেন নি। বরং উল্লেখিত প্রকল্পের মধ্যে ১২০, ১২১ এবং ১২২ নম্বর সিরিয়ালের তিনটি কাজ দেয়া হয়েছে নন রেজিস্ট্রার তিনটি প্রতিষ্ঠানে। ১২০ নম্বরের প্রকল্পে উল্লেখ করা হয়েছে বাউফল সাংবাদিক ক্লাবের জন্য আসবাবপত্র, অফিস সরঞ্জামাদি ও বৈদ্যুতিক মালামাল সরবারহ। যার ব্যয় ধরা হয়েছে এক লাখ টাকা। ১২১ নম্বর প্রকল্পে উল্লেখ করা হয়েছে বাউফল মিডিয়া কর্নারে আসবাবপত্র সরবারহ। এর ব্যয় ধরা হয়েছে এক লাখ ৫০ হাজার টাকা। ১২২ নম্বর প্রকল্পে উল্লেখ করা হয়েছে বিডি ফেস ডট কমে আসবাবপত্র সরবারহ। এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে দুই লাখ টাকা। এ প্রতিষ্ঠানের সরকারি কোন নিবন্ধন নাই। জেনে শুনে বিধি না মেনে সরকারি অর্থ অপচয় বা আত্মসাৎ করেছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
রাজস্ব তহবিলের অর্থ দিয়ে জরুরি প্রয়োজনে কেনাকাটা বা উন্নয়নমূলক কাজ দুর্যোগকালিন সময়ে করা যাবে। এ ক্ষেত্রে আরএফকিউ পদ্ধতি ব্যবহার করে উন্নয়নমূলক ওই কাজ করা যাবে। দুর্যোগকালিন কোনো পরিস্থিতি না থাকা স্বত্ত্বেও তিনি উল্লেখিত তালিকায় পাঁচ লাখ করে ২০ লাখ টাকার বিনিময়ে মোট ৪টি প্রকল্প নিয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, এসব প্রকল্পের বিনিময়ে তিনি আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন। এছাড়াও ১৮১টি সিপিসির মাধ্যমে প্রকল্প নিয়েছেন অধিকাংশ প্রকল্প দেড় থেকে দুই লাখ টাকা ব্যয়ের। প্রতি প্রকল্প থেকে ২০ হাজার করে ঘুষ বাণিজ্য করেছেন ইউএনও আমিনুল। ২০ হাজার করে ১৮১ প্রকল্প থেকে আমিনুল ঘুষ বাণিজ্য করেছেন ৩৬ লাখ ২০ হাজার টাকা।
প্রকল্প পাওয়া একাধিক ব্যক্তির সাথে কথা হয়। তারা জানিয়েছেন, তাদের প্রকল্পগুলোর অফিসিয়াল কার্যক্রম চলমান। নাম প্রকাশ করে বক্তব্য দিলে প্রকল্প বাতিল করে দিবে ইউএনও। এ কারণে তারা তাদের নাম না লেখার অনুরোধ করেন। তবে ইউএনও আমিনুল ২০ হাজার করে টাকা নিয়েছেন বলে তারা স্বীকার করেন।
খাসজমি বিক্রিতে কোটি টাকার ঘুষ
নদীবেষ্টিত বাউফল উপজেলা। এ উপজেলায় নতুন চর জেগে প্রায় তিন হাজার একর খাস জমি চাষাবাদের উপযোগী। এরমধ্যে প্রায় দুই হাজার ৫০০ একর জমি চাষের অনুমতি দিয়েছেন। জমিগুলো বন্দোবস্ত না হওয়ায় জমিগুলোতে ডিসিআর (ডপ্লিকেট কার্বন রিসিট) না দিয়ে চাষের অনুমতি দিয়ে প্রায় এক কোটি ২৫ লাখ টাকার ঘুষ বাণিজ্য করেছেন ইউএনও আমিনুল। ফলে সরকার বঞ্চিত হয়েছে মোটা অংকের রাজস্ব থেকে। পতাকার অনুুসন্ধানে জানা গেছে, চাষের অনুমতি পত্র দিয়ে প্রত্যেক চাষির কাছ থেকে একর প্রতি কারও কাছ থেকে পাঁচ হাজার আবার কারও কাছ থেকে ছয় হাজার টাকা করে ঘুষ নিয়েছেন ইউএনও আমিনুল।
তিনি তার দালালদের মাধ্যমে চাষিদের কাছ থেকে নিয়েছেন ২৫ হাজার টাকা করে। কেন একর প্রতি এক বছরে চাষিরা ২৫ হাজার টাকা দিয়ে খাস জমি ক্রয় করেছে এর অনুসন্ধানে জানা গেছে চরাঞ্চলের এ জমিগুলোতে মৌসুমী ফল তরমুজ আবাদ করা হয়। তাই তারা প্রকল্পের পরিধি অনুযায়ী ব্যক্তি মালিকানা জমির পাশাপাশি সরকারি এ খাস জমি নিয়ে প্রকল্প বাড়িয়ে নেন। এ কারণে বাধ্য হয়ে তরমুজ চাষিরা একর প্রতি ২৫ হাজার টাকা দেন। চাষের অনুমতি দেয়ার বিনিময়ে উল্লেখিত ঘুষ বাণিজ্য করলেও সরকারি হিসাব অনুযায়ী একর প্রতি ৫০০ টাকা হারে ডিসিআর বাবদ রাজস্ব হিসাবে ১২ লাখ ৫০ হাজার টাকা কোষাগারে জমা হওয়ার কথা। কিন্তু চলতি আমন মৌসুমে কোনো টাকাই জমা হয়নি।
২০২৪ সালে দেশের পট পরির্বতনের ফলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ মাত্র ২০০ একর জমির ডিসিআর দিতে সক্ষম হয়। এর আগে অতীত দিনগুলোতে ৭০০ থেকে ৮০০ একর করে ডিসিআর দিয়ে আসছিল ভূমি অফিস। তবে বাকি খাস জমিগুলো ওই উপজেলার, কেশবপুর, নাজিরপুর, কালাইয় ও চন্দ্রদ্বীপের আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা স্থানীয় এমপির নির্দেশে ভাগ ভাটোয়ারা করে ভোগ দখল করত। এদিকে ইউএনও আমিনুল পাঁচটি শর্ত দিয়ে তার স্বাক্ষরে চাষের অনুমতি দিয়েছেন। আর শর্তের মধ্যে চালাকি করে আমিনুল এক নম্বরে উল্লেখ করেন ‘উক্ত প্রত্যয়ন শুধু এক মৌসুমের জন্য প্রযোজ্য হবে। সরকারি ডকুমেন্ট হিসাবে কোনো আদালতে উপস্থাপনযোগ্য নয়।’
একটি সমবায় সমিতির সদস্য আবদাল হোসেন বলেন, ‘আমরা ১৫০ একর জমি নিয়েছি বিনিময়ে ইউএনওকে পাঁচ লাখ টাকা দিয়েছি।’ চন্দ্রদ্বীপ এলাকার মো. আসাদুল বলেন, ‘ছয় হাজার টাকার বিনিময়ে আমি এক একর জমি পেয়েছি।’ একই এলাকার মো. শাহীন বলেন, ‘আমি পাঁচ হাজার টাকার বিনিময়ে এক একর জমি পাইছি। ইউএনও স্যারে য্যার (যার) তোন (থেকে) য্যা (যা) লইয়া পারছে। আর যে যে দিয়া পারছে। এই কারোণে কেউর পাঁচ আজার আবার কেউর ছয় আজার, কেউ ২০ আজার, কেউ আবার ২৫ আজার টাহা দিয়া কেনছে।’
খাস জমির অবৈধ বাণিজ্য নিয়ে তার (ইউএনওর) কয়েকজন দালালের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসকের কাছে একাধিক লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে। কিন্তু ওইসব অভিযোগের কোনো অগ্রগতি নাই। চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নের রুহুল রাড়ি বলেন, ‘আমি ১৫ একর জমি তরমুজ চাষের জন্য ফয়সালের কাছ থেকে ক্রয় করেছি। একর প্রতি ২৫ হাজার টাকা নিয়েছে ফয়সাল। ১৫ একরে তিন লাখ টাকা দিয়েছি। এখনও ৭৫ হাজার টাকা বাকি রয়েছে।’
চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মো. রাসেল বলেন, ‘ফয়সাল দুই একর জমি বাবদ আমার কাছ থেকে ৪৮ হাজার টাকা নিয়েছে। দেয়ালে আমার পিঠ ঠেকে গেছে বাধ্য হয়ে আমি ৪৮ হাজার টাকা দিয়া জমি কিনছি।’ একই এলাকার হারুন মোল্লা বলেন, ‘আমার খতিয়ান খোলা জমি নিয়ে সরকারের সাথে মামলা চলছে। ওইজমির মধ্যে দুই একর জমি বাবদ ফয়সাল ৪৫ হাজার টাকা চায় আমার কাছে। দীর্ঘদিন আমি জমিটি ভোগদখল করে আসছি। আমি টাকা না দেয়ায় সে আমাকে মারধর করার হুমকি দিচ্ছে।’
ফয়সাল বাউফল উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের দপ্তর সম্পাদক। চরাঞ্চলের শতশত একর জমি তার মাধ্যমে চাষের অনুমতিপত্র দিয়ে টাকা তুলেছেন ইউএনও। বিষটি নিয়ে ফয়সালের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা চালানো হয়। কিন্তু ফয়সাল ডেবিল বলে অপরিচিত নম্বর তিনি ধরেন না। তাই একাধিকবার তাকে ফোনে কল দেয়া হলেও তিনি কল রিসিভ করেন নি।
টিআর–কাবিখা লুট
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৪/২০২৫ অর্থ বছরে প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ে ৫৬টি কাবিখা/কাবিটা প্রকল্প গ্রহন করা হয়। এছাড়াও একই অর্থ বছরে প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ে ৬৮টি কাবিটা প্রকল্প নেয়া হয়। প্রতিটি প্রকল্প থেকে ২০ হাজার করে ঘুষ নিয়েছেন ইউএনও নিজে। ফলে ওই দুই পর্যায়ের ১২১ প্রকল্প থেকে ২৪ লক্ষ ২০ হাজার টাকা ঘুষ নিয়েছেন ইউএনও আমিনুল। এ কারণে অধিকাংশ প্রকল্প বাস্তবায়ন হয় নি। আবার কিছু প্রকল্পে সামান্য কাজ হলেও তা দেখা গেছে নাম মাত্র। অথচ নিয়ম অনুযায়ী এসব প্রকল্পের দুর্নীতি এড়াতে প্রতিটি প্রকল্পে কাজের পরিমান/পরিধি, বরাদ্দের পরিমাণ, কাজ শুরু এবং শেষ এর সময়, অর্থ বছর, সিপিসির নাম এসব লিখে একটি সাইবোর্ড সার্টানোর নিয়ম থাকলেও ইউএনও ঘুষ নেয়ায় প্রকল্পের সিপিসিরা থোরাই কেয়ার করেনি ওই নিয়মের। ফলে অধিকাংশ প্রকল্পে কাজ না করে প্রকল্পের টাকা বা বরাদ্ধকৃত চাল উঠিয়ে কেবল লুটপাট করা হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, নাজিরপুর-তাঁতেরকাঠি ইউনিয়নের ৪নম্বর ওয়ার্ডের মজু হাওলাদার বাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় হইতে পশ্চিম দিকে খাল পর্যন্ত খাল মাটির রাস্তা দীর্ঘদিন বছর বেহাল অবস্থায় পড়ে আছে। হয়নি নূন্যতম সংস্কার কাজ। ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের নথি বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার (কাবিটা-কাবিখা) প্রকল্পের অধীনে জুন মাসে মাটির রাস্তাটি মাটি দ্বারা পুননির্মাণ কাজ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। কাজের অনুকূলে বরাদ্দের ২ লাখ ২৭ হাজার টাকাও প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি উঠিয়ে নিয়েছে।
একই অর্থ বছরের ধূলিয়া ইউনিয়নের ৫নম্বর ওয়ার্ড নিজাম চেয়ারম্যানের বাড়ি হইতে ভ্যারনতলা পাকা সড়ক পর্যন্ত মাটির সড়ক নির্মাণ বাস্তবায়ন করা হয়েছে বলে নথিতে উল্লেখ থাকলেও সরেজমিনে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। সেখানে পূর্বেই ছিল মাটির একটি রাস্তা। যা বেহাল অবস্থায় পরে আছে কয়েকবছর। চলাচলে স্থানীয়দের ভোগান্তি পোহাতে হয় প্রতিদিন। নির্মাণ কাজ না হলেও নিজাম চেয়ারম্যানের বাড়ি থেকে খান বাড়ির পূর্ব পাশে পর্যন্ত (সড়কের ৩০ভাগ) অংশে শ্রমিকের পরির্বতে ভেকু দিয়ে মাটি ফেলা হয়েছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রেও জুনেই নির্মাণ কাজের জন্য বরাদ্ধকৃত ১০ মেট্রিকটন খাদ্যশস্য (গম) সমপরিমাণ টাকা তুলে ফেলেছে বাস্তবায়ন কমিটি।
অন্যদিকে, কাছিপাড়া ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ড শাহজাহান দারোগার বাড়ির থেকে ব্রিজ পর্যন্ত সড়কের কোনো উন্নয়ন হয়নি। বর্তমানে সড়কে চলাচলের অনুগযোগী প্রায়। অথচ নথি বলছে, এই অর্থ বছরের কাবিটা কর্মসূচির আওতায় শাহজাহান দারোগা বাড়ি থেকে ব্রিজ পর্যন্ত মাটির রাস্তাটি মাটি দ্বারা মেরামতের কাজ বাস্তবায়ন হয়ে গেছে। প্রকল্পের বরাদ্দ ২ লাখ ১০ হাজার টাকা উত্তোলন করে নিয়েছে বাস্তবায়ন কমিটি।
এছাড়াও ২০২৪-২৫ অর্থ বছরের কাবিখা কর্মসূচির আওতায় কালাইয়া ইউনিয়নের কর্পূরকাঠি গ্রামে দুইটি সড়ক মাটি দ্বারা পুনঃনির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু সড়কের সুবিধাভোগীদের কাছ থেকে আদায় করা হয়েছে ১০ হাজার করে টাকা। কাবিটা কাবিখা কর্মসূচির আওয়ায় মাটির কাজ প্রকল্পের কাজ স্থানীয় দিনমজুর লোক দ্বারা মাটি কেটে নির্মাণ ও সংস্কার কাজ করাতে হবে বিধান থাকলেও কাজ করা হয়েছে ভেকু মেশিন দিয়ে। ফলে গরিব দুস্থ এবং দিনমজুর লোজকন অধিকার ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
তবে ওই অর্থ বছরের তৃতীয় প্রকল্পের তালিকা অনুসন্ধান করেও পাওয়া যায়নি। ফলে তৃতীয় পর্যায়ের ওই প্রকল্পের তালিকা হাতে না পাওয়ায় এর অনিয়ম দুর্নীতি সম্পর্কে খোঁজ নেয়া সম্ভব হয়নি। তবে সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন তৃতীয় পর্যায়ের প্রকল্পেও একই ধরণের দুর্নীতি করা হয়েছে।
বিকল নৌযানের লাখ টাকার তেল চুরি
ডাবল ইঞ্জিল চালিত একটি স্পিডবোট রয়েছে ইউএনওর তত্ত্বাবধানে। এক বছরের অধিক সময় ধরে ওই স্পিডবোট অচল অবস্থায় পরে আছে। ওই উপজেলার মৎস্য, এলজিইডি, কৃষি, খাদ্যসহ সব দপ্তরের কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে ওই স্পিডবোট ব্যবহার করে নৌপথে কোথাও যাওয়া হয়নি। আর যাওয়ারও সুযোগ নাই কারণ ওই নৌযানটি দীর্ঘ সময় ধরে বিকল অবস্থায় পড়ে আছে। সেই বিকল স্পিডবোট অনুকুলে জ্বালানী খরচ দেখিয়ে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে প্রায় দুই লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন ইউএনও আমিনুল।স্পিডবোটের জ্বালানী খরচ দেখিয়ে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে ৪৮ হাজার, ফেব্রুয়ারি মাসে ৪১ হাজার ৭০০, মার্চে ২০ হাজার ৮৫০, এপ্রিল মাসে ২০ হাজার ৮৫০ এবং মে মাসের তুলে নেয়া হয় ৮৯ হাজার ১৭৭ টাকা। মোট দুই লাখ ২০হাজার ৫৭৭ টাকা আত্মসাৎ করেছেন আমিনুল।
ইউএনওর প্রতিক্রিয়া
ইউএনও আমিনুল ইসলামের সাথে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি এ প্রতিবেদকের কাছে সাক্ষাৎ দেননি। বহুবার তাকে ফোন দেয়া হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তবে স্থানীয় সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন— ‘ইউএনওর কর্মকাণ্ড নিয়ে আপনাদের এত চুলকায় ক্যা? হাজার হাজার কাজ। ইউএনওর ফোন ধরার সময় থাকে?’ এ কথা বলেই ফোন কেটে দেন।
বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার রায়হান কাওসার বলেন, ‘ইউএনও আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে আমার দপ্তরে আরও অনেক অভিযোগ আসছে। তাকে সতর্ক করা হবে। নির্বাচনকালীন সময়ে এমনিতেই নিয়মিত বদলি করা হবে। সে পর্যবেক্ষণে রয়েছে।’
আরও পড়ুন:








