নেত্রকোনার দুর্গাপুরে একই এনটিআরসিএ নিবন্ধন সনদ ব্যবহার করে দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চাকরির অভিযোগ উঠেছে মোছা. কামরুন্নাহার নামের এক নারী শিক্ষকের বিরুদ্ধে। তিনি একদিকে দুর্গাপুর দ্বীনি আলিম মাদ্রাসায় সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন, অন্যদিকে একই সময়ে আলহাজ্ব মাফিজ উদ্দিন তালুকদার কলেজে প্রভাষক ও পরবর্তীতে অধ্যক্ষ পদে দায়িত্ব পালন করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো সূত্রে জানা গেছে, মোছা. কামরুন্নাহার ২০১২ সালের এক জুলাই দুর্গাপুর দ্বীনি আলিম মাদ্রাসায় মাধ্যমিক স্তরের আইসিটি বিষয়ের সহকারী শিক্ষক পদে যোগ দেন এবং ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত সেখানে কর্মরত থাকা অবস্থায় এমপিওভুক্ত ছিলেন।
এরই মধ্যে ২০১৫ সালের দুই জানুয়ারি তিনি একই এনটিআরসিএ নিবন্ধন সনদ ব্যবহার করে আলহাজ্ব মাফিজ উদ্দিন তালুকদার কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে প্রভাষক পদে যোগ দেন। পরে ২০২০ সালে তিনি ওই কলেজের অধ্যক্ষ পদে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
সূত্র জানায়, ওই কলেজে ২০১৫ সালের দুই জানুয়ারি মোজাহিদুল ইসলাম চয়ন অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেছিলেন। তিনি টানা পাঁচ বছর অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২০ সালে তাকে অধ্যক্ষ পদ থেকে সরিয়ে মোছা. কামরুন্নাহারকে নিয়োগ দেয়া হয় এবং মোজাহিদুল ইসলাম চয়নকে ভাইস-প্রিন্সিপাল পদে স্থানান্তর করা হয়।
স্থানীয়রা জানায়, কলেজটির গভর্নিং বডির সভাপতি ও আওয়ামী লীগের নেতা ফারুক আহমেদ তালুকদার—মোজাহিদুল ইসলামের চাচা। কলেজটি দ্রুত এমপিওভুক্ত হবে এমন সম্ভাবনা দেখা দিলে তিনি রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ভাতিজাকে সরিয়ে নিজের স্ত্রী মোছা. কামরুন্নাহারকে অধ্যক্ষ পদে নিয়োগ দেন।
২০১৩ সালের সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী, অধ্যক্ষ পদে নিয়োগের জন্য অন্তত ১২ বছরের প্রভাষক অভিজ্ঞতা প্রয়োজন। কিন্তু মোছাঃ কামরুন্নাহারের সে অভিজ্ঞতা ছিলো না।
অভিযোগ রয়েছে, ২০১৫ সালের ২৮ মে অনুষ্ঠিত অধ্যক্ষ নিয়োগ বাছাই পরীক্ষার ফলাফল ২০২০ সালে পরিবর্তন করা হয়। জালিয়াতির মাধ্যমে নতুন ফলাফল শিট তৈরি করে তাতে মোছা. কামরুন্নাহারের নাম প্রথম স্থানে দেখানো হয়। এমপিওভুক্তির সময় ওই জাল শিট সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জমা দেয়া হয়। সেখানে তিনি তার মাধ্যমিক স্তরের নিবন্ধন সনদকে প্রভাষক পদের সনদ হিসেবে উপস্থাপন করেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অভিযুক্ত কামরুন্নাহারের স্বামী ফারুক আহমেদ তালুকদার আওয়ামী লীগের দাপুটে নেতা এবং নেত্রকোনা-এক আসনের সাবেক দুইবারের সংসদ সদস্য প্রার্থী। স্থানীয়দের অভিযোগ, কলেজ গভর্নিং বডির সভাপতি হিসেবে তিনি নিজের রাজনৈতিক অবস্থান ও প্রভাব কাজে লাগিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির আখড়ায় পরিণত করেছেন।
দুর্গাপুর দ্বীনি আলিম মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মো. আব্দুর রহমান বলেন, এই প্রতিষ্ঠানে কামরুন্নাহার মাধ্যমিক স্তরের আইসিটি শিক্ষক ছিলেন। কলেজ পর্যায়ের নিবন্ধন ছাড়া তিনি কীভাবে প্রভাষক বা অধ্যক্ষ হলেন, তা আমরা জানি না। তিনি ২০২২ সাল পর্যন্ত আমাদের এখানে শিক্ষকতা করেছেন এবং হাজিরা খাতায় তার স্বাক্ষর রয়েছে।
নেত্রকোনা জেলা শিক্ষা অফিসার জাহাঙ্গীর কবীর আহাম্মদ বলেন, এভাবে একই সাথে দুই প্রতিষ্ঠানে চাকরি করার কোনো নিয়ম নেই। বিষয়টি মাউশির ময়মনসিংহ আঞ্চলিক পরিচালকের নজরে আনতে হবে।
এ বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা ময়মনসিংহ অঞ্চলের পরিচালক অধ্যাপক এ কে এম আলিফ উল্লাহ আহসান বলেন, একই সময়ে দুই প্রতিষ্ঠানে চাকরি গুরুতর অনিয়ম। তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
অভিযোগের বিষয়ে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও মোছা. কামরুন্নাহার ফোন ধরেননি। তবে বিভিন্ন মাধ্যমে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
অন্যদিকে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সুপারিশে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর ইতিমধ্যে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। নেত্রকোনা সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক আবু তাহের খানের নেতৃত্বে কমিটি দুইদফা সরেজমিন তদন্ত করে অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছে বলে জানা গেছে।
তদন্ত কমিটির সদস্যরা জানিয়েছেন, শিগগিরই তদন্ত প্রতিবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়া হবে।
আরও পড়ুন:








