তিন বছরের ছোট্ট আফিয়া রোদের ঝলমলে আলোয় খেলতে খেলতেই থমকে যায়।
বাবা কোথায়? প্রশ্ন করলেই নিশ্চুপ হয়ে যায় শিশুটা।
চোখে ভয়, হতাশা আর অজানা এক শূন্যতা।
যশোর সদরের বাউলিয়া গ্রামের কুয়াদা বাজুয়াডাঙ্গার মনিরা খাতুনের গল্পটা সিনেমার মতো হলেও পরিণতি নির্মম।
২০২০ সালে পারিবারিকভাবে বিয়ে হয় বাউলিয়া চাঁদপাড়ার মোজাফফর হোসেনের সঙ্গে। সংসার শুরু হয় স্বপ্ন দিয়ে।
২০২২ সালের ১৩ নভেম্বর তাদের ঘর আলো করে আসে কন্যা সন্তান আফিয়া।
কিন্তু সমস্যা হলো, জন্মের পরপরই শিশুটির গায়ের রঙ, চুল ও চোখের রং অন্যরকম দেখা যায়—
পুরোদস্তুর ইউরোপীয়দের মতো।
এই ‘ভিন্ন’ সৌন্দর্যই কাল হলো মনিরার জীবনে।
পরিবারে শুরু হয় সন্দেহ, অপবাদ ও গঞ্জনা।
শেষ পর্যন্ত স্ত্রীকে ‘তালাক’ দিয়ে নবজাতক সন্তানকে ফেলে প্রবাসে পালিয়ে যান মোজাফফর।
মনিরা হয়ে গেলেন ‘কলঙ্কের’ বোঝা, আর আফিয়া রয়ে গেল বাবাহীন।
মনিরা বলেন,
আফিয়া আমার বুকে মাথা রেখে ঘুমায়, কিন্তু বাবার কথা বললেই কেঁদে উঠে। কাউকে বোঝাতে পারি না সে আমাদের সন্তান।
অভাবের সংসারে বড় হওয়া মনিরা ভেবেছিলেন বিয়ে তাকে নতুন জীবন দেবে।
কিন্তু তালাকের কাগজ হাতে নেওয়ার পর জীবনটা হয়ে যায় যুদ্ধক্ষেত্র।
সকালে কাজ খুঁজতে বের হন, দুপুরে ফিরে এসে মেয়েকে কোলে নেন।
প্রতিবেশীরা সহানুভূতি দেখালেও বাস্তব জীবনের লড়াইটা একাই লড়ছেন তিনি।
স্থানীয়ভাবে শালিস বসে। একাধিকবার প্রস্তাব দেওয়া হয় ডিএনএ পরীক্ষা করে সত্য প্রমাণ হোক।
কিন্তু পাষণ্ড পিতা মোজাফফর তা মানেননি।
পালিয়ে যান বিদেশে, আর দায়িত্ব চাপিয়ে দেন সমাজের উপর।
রামনগর ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান রামপ্রসাদ রায় বলেন। মোজাফফরকে ডিএনএ পরীক্ষার কথা বলেছি। কিন্তু তিনি কর্ণপাত করেননি। শিশুটির ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দিয়েছেন।
চিকিৎসকদের মতে, শিশুটির জন্মগত রোগ অ্যালবিনিজম। চামড়া, চুল ও চোখের রঙে রঞ্জকের অভাব থাকলেই এমন হয়।
দোষ কারও নয়
এটা শুধু একটি জেনেটিক অসংগতি, যার চিকিৎসা এখনো পুরোপুরি আবিষ্কৃত নয়।
যশোর সদর হাসপাতালের কনসালটেন্ট কানিজ ফাতেমা এ্যানি জানান।
এ ধরনের শিশুদের বিশেষ যত্ন ও নিরাপদ পরিবেশ প্রয়োজন। সমাজের ভুল ধারণা দূর করতে হবে।
মনিরা-আফিয়ার পাশে আছি, জেলা প্রশাসক
ঘটনা জানার পর যশোরের জেলা প্রশাসক মো. আজহারুল ইসলাম আশ্বাস দিয়েছেন সরকারি সহায়তা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে মা-মেয়ের জন্য।
অভিযুক্ত মোজাফফরের পরিবারের সাথে যোগাযোগ করা হলেও কথা বলতে রাজি হননি কেউ।
তিন বছরের ছোট্ট শিশুটির চোখে প্রশ্ন
বাবা কি কখনো ফিরে আসবে? নাকি সমাজের কুসংস্কারই তার ভবিষ্যৎ গ্রাস করবে?
মানুষ যখন রঙে নয়, হৃদয়ে মানুষ চেনা শিখবে হয়তো তখন আফিয়া আর মনিরাদের কষ্টের গল্প লিখতে হবে না।
আরও পড়ুন:








