রবিবার

১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ৩ ফাল্গুন, ১৪৩২

নেত্রকোনায় আওয়ামী নেতার কলেজে দুর্নীতির মহোৎসব; নিবন্ধন বাতিলের দাবি

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৩০ অক্টোবর, ২০২৫ ২০:১৪

আপডেট: ৩০ অক্টোবর, ২০২৫ ২০:৪৫

শেয়ার

নেত্রকোনায় আওয়ামী নেতার কলেজে দুর্নীতির মহোৎসব; নিবন্ধন বাতিলের দাবি
সংগৃহীত ছবি

নেত্রকোনা জেলার দুর্গাপুর উপজেলায় নকলের মাধ্যমে শিক্ষার মানহানি, সনদজালিয়াতির মাধ্যমে অধ্যক্ষ নিয়োগ, শিক্ষা ব্যবসা, নিয়োগ-বাণিজ্যসহ আওয়ামী ক্ষমতাবলে নানা অনিয়ম-দুর্নীতির প্রমাণ মেলায় আলহাজ্ব মাফিজ উদ্দিন তালুকদার কলেজের নিবন্ধন বাতিল, নাম পরিবর্তন ও সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের দ্রুত বিচারের দাবি উঠেছে। গত ১৬ অক্টোবর এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর বাংলা এডিশনে প্রকাশিত "নকলের সুযোগ না পাওয়ায় 'আওয়ামী নেতা'র কলেজে ফেলের হিড়িক" শিরোনামের প্রতিবেদনটির সূত্র ধরে এ দাবি আরও জোরালো হয়।

স্বৈরাচার হাসিনা পতনের পর নকল সরবরাহের একাধিক অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ময়মনসিংহ শিক্ষাবোর্ড কর্তৃক কলেজটির পূর্বের পরীক্ষাকেন্দ্র বদলের পর এবার ২০২৫ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় পাশের হার শতভাগ থেকে নেমেছে এসেছে ২.৮ শতাংশের কোটায়। এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় মোট পরীক্ষার্থী ১০৭ জনের মধ্যে ১০৪ জন শিক্ষার্থী ফেল করেছে। পাশ করেছে মাত্র ৩ জন।

অথচ আওয়ামী লীগ আমলে এই কলেজটি এইচএসসির ফলাফলে নেত্রকোনা জেলায় শতভাগ পাশে বারবার গোল্ডমেডেলপ্রাপ্ত ও জেলার শ্রেষ্ঠ কলেজ হিসেবেও পরপর তিনবার পদকপ্রাপ্ত! এর আগে কলেজটির প্রতিষ্ঠাতা আওয়ামী নেতা ফারুক আহমেদ তালুকদার যে কলেজের অধ্যক্ষ, সেই দুর্গাপুর মহিলা ডিগ্রি কলেজ কেন্দ্রে মাফিজ উদ্দিন তালুকদার কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সুবিধার বন্দোবস্ত করে নকল সরবরাহ করা হতো বলে জানা যায়।

দুর্গাপুর মহিলা ডিগ্রি কলেজ কেন্দ্রের একাধিক শিক্ষক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "কলেজের অধ্যক্ষ ফারুক আহমেদ ও তার ভাই নূর আহমেদ তালুকদার শুধু নকল সরবরাহ না, আমাদের কলেজের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জামাদি চুরি করে আলহাজ্ব মাফিজ উদ্দিন তালুকদার কলেজে নিয়ে যায়"। অসাধু উপায়ে নিজেদের বাবার নামে প্রতিষ্ঠিত কলেজের নামডাক বৃদ্ধি করে শিক্ষাব্যবসা ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিকরণ, কিশোর গ্যাং প্রতিপালন করার পাশাপাশি অবৈধভাবে অধ্যক্ষ পদে বসে দুর্গাপুর মহিলা ডিগ্রি কলজকেও ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ করেন তারা।

আওয়ামী লীগ আমলে স্বামীর ক্ষমতায় বারবার শ্রেষ্ঠ কলেজ অধ্যক্ষ পদকপ্রাপ্ত মোছাঃ কামরুন্নাহারের বিরুদ্ধেও নিবন্ধন সনদ জালিয়াতি করে প্রথমে প্রভাষক পরে অবৈধ উপায়ে অধ্যক্ষ পদে নিয়োগ পাওয়ার প্রমাণ মেলেছে । এমনকি তার অধ্যক্ষ পদে নিয়োগের সাক্ষাৎকারের ফলাফল শিটে ফলাফল কারচুপির সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে। তাকে ৩০ নম্বর দিয়ে প্রথম স্থান অধিকারী দেখানো হলেও, তালিকার ৩ নং প্রার্থীর মোট নম্বর ছিল ৩২। এই জালিয়াতির বিষয়টি সম্প্রতি আরও জোরালো ভিত্তি পেয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে নেত্রকোনা সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক আবু তাহেরের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি তদন্ত দল সরেজমিনে তদন্তে আসে ।এই তদন্তে উপজেলা পর্যায়ের কমিটি কর্তৃক নম্বরপত্রটির সত্যতা প্রমাণিত হয়। এই নম্বরপত্রটি সামনে আসার পর একাধিক প্রশ্ন উঠেছে: ১) নম্বরপত্রে সুস্পষ্ট গড়মিল থাকা সত্ত্বেও কীভাবে তাকে প্রথম ঘোষণা করা হলো? ২) ফলাফলের ছকে তাকে ‘নিবন্ধনকৃত উল্লেখ করা হলেও তার কলেজ পর্যায়ের প্রভাষক নিবন্ধন নেই; তিনি স্কুল পর্যায়ের সহকারী শিক্ষক নিবন্ধন সনদ ব্যবহার করেছেন, যা জালিয়াতির শামিল। ৩) নিয়োগের জন্য কোনো উপযুক্ত প্রার্থীই কি ছিলেন না? এবং ৪) তালিকার ৩ নং প্রার্থীর নিবন্ধন সনদ ছিলো না যা নম্বর পত্রে স্পষ্ট উল্লেখ আছে, তবে কি তাকেও নিয়োগ বাণিজ্যের মাধ্যমে প্রভাষক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিলো?

অভিযুক্তদের দাবি, "অধ্যক্ষ পদটি প্রশাসনিক পদ।এমবিবিএস বা এলএলবি ডিগ্রিধারী ব্যক্তিও অধ্যক্ষ হতে পারেন। অধ্যক্ষ নিয়োগের ক্ষেত্রে নির্ধারিত কোনো সাবজেক্ট বা বিষয় নেই।"

তবে অধ্যক্ষ পদে নিয়োগের আগে তিনি কোন বিষয়ের প্রভাষক ছিলেন আর অধ্যক্ষ নিয়োগ বিধিমালা অনুসারে প্রভাষক হিসেবে ১২ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা ছিলো কিনা এই বিষয়ে কোনো ব্যাখা দিতে পারেন নি। উল্টো তদন্তের মুখে হাইকোর্টের রিট কপি দাখিল করে সময়ক্ষেপণের চেষ্টা হয়েছে, যদিও আদালত কোনো স্থগিতাদেশ দেননি।

আওয়ামী লীগ আমলে এসব দুর্নীতি নিয়ে কথা বললেই স্বাধীনতাবিরোধী, বিএনপি-জামায়াত, রাজাকার ট্যাগ দিয়ে হয়রানি করা হতো। ৫ আগস্ট পরবর্তী পরিবর্তিত বাস্তবতায় এসব অপরাধী কিভাবে এখনও অক্ষত আছে, তা নিয়ে স্থানীয়ভাবে তীব্র সমালোচনা চলছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কলেজ শিক্ষক জানান, "শুধু শিক্ষক পদে না কর্মচারী নিয়োগেও এই চক্রটি দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল টাকা আত্মসাৎ করেছে। একজন হিসাবসহকারী নিয়োগে বিধিমোতাবেক বাণিজ্য শাখার সার্টিফিকেটধারী হতে হয়,কিন্তু আলহাজ্ব মাফিজ উদ্দিন কলেজে নিয়মের ব্যতয় ঘটিয়ে বিধিবহির্ভূতভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে মানবিক শাখা থেকে। সুষ্ঠু তদন্ত হলে সব দুর্নীতি প্রমাণিত হবে।"

আলহাজ্ব মাফিজউদ্দিন তালুকদার কলেজের নিবন্ধন অতি দ্রুত বাতিল করার হোক এমন দাবি জানিয়ে

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল দুর্গাপুর পৌর ছাত্রদলের যুগ্ম আহবায়ক সালমান মুক্তাদির জানান," যে কলেজের সভাপতি স্বামী আর স্ত্রী হচ্ছে প্রিন্সিপাল এবং অযোগ্য ভাই,ভাতিজা-ভাতিজি,শালা-শালী, ভাগিনা-ভাগিনি আত্মীয় ও পারিবারিক কোটায় শিক্ষক ও কর্মচারী সহ প্রায় ২৩ জন নিয়োগ প্রাপ্ত বড় অংকের টাকার বিনিময়ে।সেই কলেজের রেজাল্ট এর চেয়ে ভালো আশা করাও বোকামি। আমরা দুর্গাপুরবাসী অনেক বেশি লজ্জিত। " তিনি আরও জানান, "আওয়ামী লীগ নেতা অধ্যক্ষ ফারুক সাহেব মূলত চাকরি বাণিজ্যও প্রশ্নপত্র ফাঁসের বাণিজ্য এবং জিপিএ ৫ বাণিজ্য করার উদ্দেশ্যেই মূলত আলহাজ্ব মাফিজুদ্দিন তালুকদার কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যার প্রমাণ এই ফলাফল কারণ এইবার আর তিনি পরীক্ষার আগে প্রশ্নপত্র হাতে পান নাই যার ফলে এই ভরাডুবি! তাই এলাকার সচেতন নাগরিকগণ এখনই চাচ্ছেন শিক্ষা বোর্ড থেকে যেন এই কলেজের নিবন্ধন ও রেজিস্ট্রেশন অতি দ্রুত বাতিল করা হয়।"

বাংলাদেশ ইসলামি ছাত্রশিবির দুর্গাপুর থানার সভাপতি হেদায়েতুল্লাহ শেখছাবীল খুব দ্রুতই দুর্নীতির সাথে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।

স্থানীয়দের অনেকেই কলেজটির নিবন্ধন বাতিলের পাশাপাশি নাম পরিবর্তনেরও দাবি জানিয়েছেন। তাদের অনেকে কলেজটির নাম পরিবর্তন করে দুর্গাপুরের সন্তান জুলাই গণঅভ্যুত্থানে চার শহীদের যেকোনো একজনের নামে অথবা মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বুদ্ধিজীবি অধ্যাপক আরজ আলী নামে নামকরণের দাবি জানিয়েছেন। আবার অনেকেই স্থানীয় বিএনপি নেতা আলহাজ্ব ইমাম হাসান আবু চানের নামে কলেজটির নতুনভাবে নামকরণ ও সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন।

গত একবছরেও কেনো অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি এ বিষয়ে জানতে চাইলে দুর্গাপুর উপজেলা নির্বাহীর কর্মকর্তা জনাব আফরোজা আফসানা বলেন, "ঘটনাটি গতবছরের। আমি এখানে এই আগস্ট মাসে নতুন জয়েন দিয়েছি। আগের ইউএনও স্যারের সাথেও আমাকে কথা বলতে হবে। বিস্তারিত জেনে আমি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবো।"



banner close
banner close