কুষ্টিয়া সিভিল সার্জন অফিসের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, ঘুষ বাণিজ্য সহ ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. হোসেন ইমাম ও জেলা সিভিল সার্জন শেখ মোহাম্মদ কামাল হোসেনের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ তোলা হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও পুনরায় নিয়োগ পরীক্ষার দাবিতে সিভিল সার্জন অফিসে মানববন্ধন করেছেন সচেতন মহলের মানুষ। শনিবার (২৫ অক্টোবর) দুপুরে এ কর্মসূচি পালন করা হয়৷ এসময় সিভিল সার্জন অফিসের মুল প্রবেশ গেটে তালা লাগিয়ে দেন।
অভিযোগ রয়েছে, বৃহস্পতিবার (২৪ অক্টোবর) ভোর রাতে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. হোসেন ইমামের বাসভবনে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস করা হয়। চাকরিপ্রার্থীরা রাতে তার বাসায় অবস্থান করছিলো৷ রাতভর তাদের উত্তর মুখস্থ করানো হয়। ওই বাসা থেকে তাদের বেরিয়ে আসার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। এ বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। সচেতন মহলের মানুষ নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে দোষীদের শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের আরএমও ডা. হোসেন ইমাম বলেন, আমার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। এসব বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। ঘটনাটি ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। ষড়যন্ত্র করে আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।
জানা গেছে, কুষ্টিয়া সিভিল সার্জন অফিসের অধীনে ৯৭ জন স্বাস্থ্য সহকারী নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। গত শুক্রবার সকাল ১০টায় ওই নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এই পরীক্ষার আগে সকালে বেশ কিছু চাকরিপ্রার্থীকে কুষ্টিয়া ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) হোসেন ইমামের বাসা থেকে বের হতে দেখা যায়। এ সময় সাংবাদিকরা কুষ্টিয়া শহরের টালিপাড়ায় আরএমও হোসেন ইমামের পৈতৃক পাঁচতলা বাড়ির সামনে তাদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করলে তারা দৌড়ে পালিয়ে যান। সামাজিক মাধ্যমে আরএমওর বাসা থেকে চাকরিপ্রার্থীদের বেরিয়ে আসার একটি ভিডিও ভাইরাল হলে সমালোচনা শুরু হয়।
আরও জানা গেছে, শুক্রবার ফজরের আজানের আগে ভোর ৪টার দিকে অ্যাম্বুলেন্সে করে বেশ কয়েকজন পরীক্ষার্থীকে জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে নিউ সান ক্লিনিকে আনা হয়। খবর পেয়ে সেখানে কয়েকজন সাংবাদিক জড়ো হন। তাদের সামনেই আরও কয়েক পরীক্ষার্থী ক্লিনিকে প্রবেশ করেন। পরে সকালের দিকে সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে পরীক্ষার্থীদের ক্লিনিকের পেছন দিয়ে বের করে আরএমওর বাসায় নেওয়া হয়। ক্লিনিকে অন্তত ৪০ জন পরীক্ষার্থী ছিলেন। পরে সাংবাদিকরা আরএমওর বাসার সামনে জড়ো হন। সকাল ৭টা থেকে সাড়ে ৮টার মধ্যে ওই বাসা থেকে ফাইল হাতে বেশ কয়েকজন যুবককে বের হতে দেখা যায়। সাংবাদিকরা কথা বলতে গেলে তারা দৌড়ে পালিয়ে যান। এদিন সকাল ১০টায় শহরের বিভিন্ন কেন্দ্রে নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। আরএমওর বাসা থেকে বের হওয়া যুবকরা এই পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন বলে একাধিক সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
অভিযোগ উঠেছে, পরীক্ষার্থীদের এভাবে এনে জড়ো করে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র দেওয়া হয় এবং তারা সেগুলোর উত্তর মুখস্থ করেন। আরএমও হোসেন ইমামের বড় ভাই হাসান ইমাম নান্নু কুষ্টিয়া সিভিল সার্জন অফিসের উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার হিসেবে কর্মরত আছেন। সকালে বাসার সামনে এসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন হাসান ইমাম নান্নু। তিনি একজন সাংবাদিককে ডেকে বিষয়টি নিয়ে নিউজ না করতে বাকিদের ম্যানেজ করার প্রস্তাব দেন।
এসব অভিযোগ অস্বীকার করে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) হোসেন ইমাম আরও বলেন, আমার বাসায় শিক্ষার্থীরা ভাড়া থাকেন। সেখান থেকে এসব শিক্ষার্থীকে বেরোতে দেখে অনেকে বিষয়টি ভুলভাবে ব্যাখ্যা করছেন। আমি ওই নিয়োগ পরীক্ষার ব্যাপারে কিছু জানি না। আমার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন।
সিভিল সার্জন অফিসে মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, সিভিল সার্জন অফিসে নিয়োগ পরীক্ষায় ব্যাপক অনিয়ম দুর্নীতি করা হয়েছে। এই নিয়োগ পরীক্ষা বাতিলের দাবি জানাচ্ছি। দুর্নীতির প্রতিবাদে ও বিচারের দাবিতে আমরা সিভিল সার্জন অফিসে তালা মেরে দিয়েছি। আমাদের দাবি মানা না হলে আমরা কঠোর আন্দোলনে যাবো। কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের আরএমও হোসেন ইমাম ও সিভিল সার্জন শেখ মোহাম্মদ কামাল হোসেনকে কুষ্টিয়া থেকে অপসারণ করতে হবে। এত বড় ঘটনা ঘটে গেলেও কুষ্টিয়ার ডিসি সাহেব ঘুমাচ্ছেন। এখন পর্যন্ত তিনি কোনো পদক্ষেপ নেন নি।
বক্তারা আরও বলেন, সিভিল সার্জন ও আরএমও নিয়োগ বানিজ্য করেছে। দিনের পরীক্ষা রাতে নিয়েছে। আরএমও হোসেন ইমামের বাসায় রাতে প্রশ্ন ফাঁস করা হয়। রাতেই সেখানে পরীক্ষা নেয়া হয়েছে। এই পরীক্ষা আমরা মানি না। এই পরীক্ষা বাতিল করে পুনরায় পরীক্ষা নেয়া হোক। এ ঘটনায় জড়িত সিভিল সার্জন ও আরএমও'র বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। দোষীদের শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।
পরীক্ষার্থীর আত্মীয়রা জানান, ডা. হোসেন ইমামের ভাই নান্নুর সঙ্গে তাদের চুক্তি হয়েছে। তাদের ক্লিনিকে পরীক্ষার্থীদের অ্যাম্বুলেন্সে করে আনা হয়। আগে থেকে সেখানে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র আনা হয়। পরীক্ষার্থীদের কয়েকটি কক্ষের মধ্যে বসিয়ে প্রশ্ন দেওয়া হয়। তাদের কাছ থেকে মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয়। তিন থেকে চার ঘণ্টা সময় দেওয়া হয় প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করার জন্য। এ জন্য প্রত্যেকের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ নেওয়া হয়। তবে সাংবাদিকরা বিষয়টি টের পেয়ে যাওয়ায় ঝামেলা তৈরি হয়। একজন পরীক্ষার্থীর স্বজন জানান, তারা ১৩ লাখ টাকায় চুক্তি করেছেন। আরেক পরীক্ষার স্বজন জানান, তাদের সঙ্গে ১৬ লাখ টাকার চুক্তি হয়েছে।
পরীক্ষা বর্জন করা পরীক্ষার্থী আব্দুস সালাম বলেন, সীমাহীন নিয়োগ-বাণিজ্য ও দুর্নীতির কারণে আমি এই পরীক্ষা থেকে বিরত থাকলাম। কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালের আরএমও ও তার বড় ভাই প্রায় ২৫-৩০ জন পরীক্ষার্থীকে রাতভর তাদের বাসায় রাখেন। সকালে দেখি ওই বাসা থেকেই তারা পরীক্ষার হলে যাচ্ছে। নিশ্চয়ই তাদের প্রশ্নপত্র দেখানো হয়েছে। আমরা পরিশ্রম করে পরীক্ষা দিতে এসেছি এমন অনিয়ম হলে পরীক্ষার কোনো মানে হয় না।
এক পরীক্ষার্থীর স্বামী মো. মহিদুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে কিছুই গোপন থাকে না। ভোররাতে ভিডিওতে দেখলাম শিক্ষার্থীরা অ্যাম্বুলেন্সে করে আরএমওর বাসায় ঢুকছে ও বেরোচ্ছে। শুনেছি এই চাকরির জন্য ১৪ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হচ্ছে। ভেবেছিলাম নতুন সরকারের আমলে দুর্নীতি কমবে কিন্তু বাস্তবে তা আরও বেড়েছে।
এ বিষয়ে কথা বলার জন্য জেলা সিভিল সার্জন শেখ মোহাম্মদ কামাল হোসেনের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করলেও তিনি রিসিভ করেননি।
এ বিষয়ে কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক আবু হাসনাত মোহাম্মদ আরেফিন জানান, এই নিয়োগ পরীক্ষার সঙ্গে ডা. হোসেন ইমামের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। তবে তার বাসা থেকে কিছু যুবক ফাইলপত্র হাতে বের হয়ে আসছে। এমন একটি ভিডিও তিনি সামাজিক মাধ্যমে দেখেছেন। ওই যুবকরা সিভিল সার্জন অফিসের চাকরিপ্রার্থী কিনা, সেটা নিশ্চিত করে এখনই বলা যাচ্ছে না। বিষয়টি তদন্তের জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন। ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেলে দোষীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আরও পড়ুন:








