পার্বত্য চট্টগ্রাম সমন্বিত ও টেকসই পৌর পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায়ও এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) এর ৩৫০কোটি টাকারও বেশি অর্থায়নে বান্দরবান পৌর এলাকায় নতুন পাইপ লাগানোর কাজ করছে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের অধীনে কাজটি বাস্তবায়ন করছে আরএফএল গ্রুপ। ইতিমধ্যে নিম্নমানের পাইপ ব্যবহার, মাটির অগভীরে পাইপ বসানো, বেশির ভাগ স্থানে পাইপ লাইনের মধ্যে বালু না দেয়া ও পৌর এলাকার প্রায় ২০কোটি টাকার রাস্তা নস্ট করার অভিযোগ উঠেছে। এদিকে নিম্নমানের এবং কম পুরুত্বের পাইপ ও তা মাটির অগভীরে বালু বিহীন বসানোর কারণে স্থায়ীত্বের আশংকা করছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়রা জানায়, বান্দরবানের পৌর এলাকায় সার্বক্ষণিক পানি সরবরাহের জন্য নতুন করে মাটির নিচে পানির পাইপ বসানো হচ্ছে। পাইপ লাইন বসানোর কাজটি করছে নামিদামি প্রতিষ্ঠান আরএফএল কোম্পানী। তাদের অভিযোগ আরএফএল কোম্পানী নিজস্ব কোম্পানীতে তৈরি করা নিম্নমানের পাইপ দিয়ে যেনতেন ভাবে কাজ করে যাচ্ছে। আর এ পাইপ গুলো মাটির নিচে বসানোর সময় বেশির ভাগ স্থানেই দিচ্ছেনা কোন বালু। যেখানে লোকালয় আছে সেসব জায়গাতেও লোক দেখানো নামে মাত্র বালু দেয়া হচ্ছে। আর পাইপ লাইন বসানোর জন্য সারাদিন মাটি খুঁড়ে এবং রাতের আঁধারে মাটির নিচে পাইপ বসানো হয়। নিম্নমানের পাইপ হওয়ার কারণেই রাতের বেলায় পাইপ বসানোর কাজ করা হয় বলে জানালেন স্থানীয়রা।
এদিকে অতিসম্প্রতি নিম্নমানের কাজ করায় এলাকাবাসীরা কাজে বাঁধা দিলে আরএফএল কোম্পানীর লোকজন স্থানীয় প্রশাসন দিয়ে তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করে এবং পরবর্তীতে আবার বাঁধা দিলে জেলে ঢুকিয়ে দেবার হুমকিও প্রদান করে। তাদের মতে, বান্দরবানের নির্বাহী প্রকৌশলী অনুপম দে মোটা অংকের কমিশন নিয়ে নিম্নমানের কাজের অভিযোগ পেয়েও এ ব্যাপারে কোন ব্যবস্থা নিচ্ছেননা বান্দরবানের তদারকিতে থাকা কর্মকর্তারা। তারা বলেন, এবিষয়ে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া দরকার।
সরেজমিনে দেখাগেছে, রাতের আঁধারে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান আরএফএল কোম্পানির নিয়োজিত ম্যানেজারের উপস্থিতিতে রাতের আঁধারে পাইপ লাইন বসানোর কাজ চলছে। পাশে স্যাম্পল রাখা হলেও যেসব পাইপ বসানো হচ্ছে সেগুলো স্যাম্পলের চেয়ে অনেকটা ভিন্ন। দেখলেই যে কেউ বুঝতে পারে পাইপগুলো অত্যান্ত নিম্নমানের ও কম পুরুত্বের।এছাড়া বর্ষাকালে রাস্তা কেটে গর্ত করার কারণে পৌর এলাকার প্রতিটি অলিগলিতে কাঁদা জমে ও রাস্তার উপর মাটি পড়ে চলাচলের অনুপযোগি হয়ে পড়েছে। এতে ভোগান্তিতে পড়েছে এলাকার সাধারণ মানুষ। এদিকে বান্দরবান টাউন হলের পাশে একটি মাঠে নিম্নমানের পাইপ স্টক করে রাখা হয়েছে।
বান্দরবানের কয়েকজন পাইপ বিক্রেতার সাথে আলাপ করলে তারা জানায়, পৌর এলাকায় সার্বক্ষণিক পানি সরবরাহের জন্য যে পাইপ ব্যবহার করা হচ্ছে, তার পুরুত্ব একেবারেই কম। কয়েক বছরের মধ্যে পাইপগুলো মাটির এবং গাড়ির চাকার চাপ পড়ে চ্যাপ্টা হয়ে যাবে। এত কোটি টাকা ব্যয়ে এত নিম্নমানের পাইপ ব্যবহারের কোন মানে হয়না। অবশ্যই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার বিষয়টি তদন্ত করা দরকার।
এ ব্যাপারে কালাঘাটার ফোরকান বলেন, বান্দরবানে যে পাইপ লাইনের কাজ চলমান তা অত্যান্ত নিম্নমানের পাইপ। কয়েক বছরের মধ্যে এ পাইপগুলো মাটির চাপে চ্যাপ্টা হয়ে যাবে।
ইসলামপুরের জহির উদ্দিন বলেন, আমাদের এলাকায় রাতের আঁধারে পাইপ বসানো হচ্ছে। আমরা কিছু বললে আমাদের টাকা দিয়ে সহযোগিতা করতে বলে। টাকা না দিতে না পারলে এ ব্যাপারে কোন কথা না বলার জন্য জানায়।
এদিকে অতিসম্প্রতি বাঁধা দেয়া প্রসঙ্গে এলাকাবাসীর মধ্যে চেয়ারম্যান পাড়ার মো: মুজিবর রশিদ, মিন্টুসহ কয়েকজন বলেন, পাইপ নিম্নমানের এবং যতটুকু গভীরে পাইপ দেবার কথা ততটুকু গভীরে দেয়া হচ্ছেনা। এছাড়া পাইপের নিচে বালুও দেয়া হচ্ছেনা। পাইপগুলো বসানো হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদের জন্য। কিন্তু এত পাতলা পাইপ যদি সরাসরি মাটিতে বসানো হয় তাহলে টেকসই হবেনা। তাই আমরা পাড়াবাসীরা কাজ বন্ধ করে দিয়েছিলাম। কিন্তু কর্তৃপক্ষ চাপ প্রয়োগ করে জোর পূর্বক কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
তবে সবকিছু অস্বীকার করে ঠিকাদারের সাইট ম্যানেজার মো: শাহীন বলেন, দিনের বেলায় গর্ত করে গিয়ে রাত হয়ে যায়। তাই বাধ্য হয়ে পাইপ বসাতে হয় রাতে। কাজে কোন অনিয়ম হচ্ছেনা এবং পাইপগুলো যথেষ্ট উন্নতমানের দাবি করে তিনি বলেন, আমরা পাইপগুলো বসাতে রাস্তার যে ক্ষতি হচ্ছে তা কোম্পানী ঠিক করে দিবে নিজ খরচে।
প্রকাশ্যে নিম্নমানের পাইপ স্টক করে রাখা অবস্থায় ছবি তুলতে গেলে স্টোর কিপার জাহেদ হোসেন বলেন, পাইপের ছবি তুলতে কর্তৃপক্ষের অনুমতি লাগবে। অনুমতি ছাড়া কোন ভাবেই ছবি তোলা যাবেনা। নিম্নমানের পাইপ ব্যবহার করার বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, সব জায়গাতেই কম বেশি অনিয়ম হয়, এখানে যে পাইপ ব্যবহার হচ্ছে তার চেয়ে আরো অনেক খারাপ পাইপও অনেক জায়গায় ব্যবহার হচ্ছে।
পৌর এলাকার কি পরিমান রাস্তা নস্ট হয়েছে এবং কবে নাগাদ এগুলো মেরামত করা হবে তা জানতে বান্দরবান পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী বিরল বড়ুয়াকে একাধিক বার মুঠোফোনে কল দিলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
এদিকে বান্দরবান জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী অনুপম দে বলেন, ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান আরএফএল কোম্পানী ২৫পারসেন্ট ল্যাসে কাজগুলো নিয়েছে তাই কাজগুলো একটু এদিক সেদিক হবেই। তবে কাজে কোন অনিয়ম হচ্ছেনা।
আরও পড়ুন:








